আমনের বাম্পার ফলনেও কমেনি চালের দাম

0
39
(দিনাজপুর২৪.কম) চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে কষ্টের সীমা নেই দেশের মানুষের। আশা ছিল আমন মৌসুমে নতুন ধান উঠলে কমবে দাম, মিলবে স্বস্তি। তবে ভোক্তার সে আশাতেও গুড়েবালি। আমনের বাম্পার ফলনেও চালের বাজার বেসামাল। নতুন ধান বাজারে এলেও দাম না কমে উল্টো আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, কেজিতে বেড়েছে চার থেকে পাঁচ টাকা। আর মোটা চালে দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, কেজিতে তিন থেকে চার টাকা। বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ধান-চালের ব্যবসায়ীরা বাজারে এতটাই জোরালো সিন্ডিকেট তৈরি করেছে যে, নতুন ধান এলেও বাজারের দামে কোনো প্রভাব ফেলছে না। সরকার মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট না ভাঙা পর্যন্ত চালের বাজারে কোনো স্বস্তি আসবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে সারা দেশে ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর আবাদ হয়েছিল ৫৯ দশমিক ৫৪ হেক্টর জমিতে। এবার আমন ধানের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন। আর হেক্টরপ্রতি উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৫৬ মেট্রিক টন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) বাদল চন্দ্র বিশ্বাস শনিবার বলেন, ‘এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। আমরা হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ৫৬ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিলাম। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণে ধান কাটা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন হচ্ছে ৩ দশমিক ৬০ থেকে প্রায় ৪ মেট্রিক টন পর্যন্ত। সুতরাং বলা যায়, এবার আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে।’ তবে নতুন ধান এলেও বাজারে চালের দাম না কমে আরও বেড়েছে। শনিবার রাজধানীর বেশ কয়েকটি চালের বাজার ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলা জানা গেছে, সংকটের খবরে হঠাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল ক্রয়, বাজার থেকে করপোরেট কোম্পানিগুলোর চাল ক্রয় এবং উৎপাদন খরচ বেশি-চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে এ তিন অজুহাত দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে চালের দাম কেজিতে বেড়েছে চার থেকে পাঁচ টাকা। আর পাইকারি বাজারে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

শনিবার রাজধানীর কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুচরা বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৬ টাকা। নাজিরশাইল চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা, মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল ৬০ থেকে ৬৪ টাকা এবং মোটা স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকা ও হাইব্রিড মোটা ৫২ থেকে ৫৪ টাকা। এক সপ্তাহ আগেও খুচরা বাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৬৫ থেকে ৭২ টাকা, নাজিরশাইল চাল ৬৫ থেকে ৭৮ টাকা, মাঝারি মানের বিআর আটাশ চাল ৫২ থেকে ৫৬ টাকা, মোটা চাল স্বর্ণা ৪৬ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা ৪৬ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল।

পাইকারি বাজারে চিকন চালপ্রতি কেজি মিনিকেট মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। ৫০ কেজির বস্তা ৩৪০০ থেকে ৩৫৫০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে মানভেদে বিক্রি হয়েছিল ৬২ থেকে ৬৯ টাকা আর বস্তা ৩০০ থেকে ৩৪০০ টাকা। নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৩ থেকে ৭৫ টাকা আর ৫০ কেজির বস্তা ৩২৫০ থেকে ৩৭৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছিল ৬০ থেকে ৭২ টাকা, বস্তা ৩০০০ থেকে ৩১০০ টাকা। মাঝারি মানের প্রতি কেজি বিআর ২৮ নম্বর প্রতি কেজি চাল ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা আর বস্তা ২৭৫০ থেকে ২৮৫০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৫৫ থেকে ৫৫ টাকা, বস্তা ২৭০০ থেকে ২৭৫০ টাকা। মোটা চাল প্রতি কেজি স্বর্ণা মানভেদে ৫০ থেকে ৫২ টাকা আর বস্তা ২৫০০ থেকে ২৬০০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা, বস্তা ২৩৫০ থেকে ২৪০০ টাকা। হাইব্রিড ধানের চাল বা সবচেয়ে মোটা চালের দাম কেজিতে ৪৬ টাকা আর বস্তা ২৩০০ টাকা, যা আগে ছিল ৪১ টাকা কেজি, বস্তা ২০৫০ টাকায় বিক্রি হতো।

আমনের ভরা মৌসুমেও চালের দাম না কমার কারণ সম্পর্কে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘বাজারে ধান-চালের যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তাদের শিকড় এত গভীরে যে, সরকার বা অন্য কেউ তাদের কিছুই করতে পারছে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে- যখন থেকে চালের বাজারে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায় নেমেছে তখন থেকেই চালের বাজার বেশি বেসামাল। অর্থাৎ চালের দাম না কমার পেছনে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় বেশি। এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।’

 

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ক্রেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘এক কেজি চাল কিনতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা গুনতে হচ্ছে। এটা কল্পনাও করিনি। ব্যবসায়ীরা যে লুটপাট করে খাচ্ছেÑসরকার চেয়ে চেয়ে দেখছে কেন। ব্যবসায়ীরা আমাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। আমাদের রক্ত পানি করা রোজগারের টাকা তারা লুটপাট করছে।’

রাজধানীর পুরান ঢাকার বাবুবাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘বাজারে চালের কোনো সংকট নেই। নতুন আমন চালও আসতে শুরু করেছে। কিন্তু দাম বেশি। মিল পর্যায়েই দাম বাড়ছে চালের। মিলে না কমলে বাজারে চালের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
মাঠ পর্যায়ে আমনের ফলনের চিত্র
সারা দেশে এবার আমনের ভালো ফলন হয়েছে। বেশ কয়েকটি জেলা প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদনে সে চিত্র ফুটে উঠেছে। দিনাজপুর থেকে জানান, দিনাজপুরে চলতি মৌসুমে জেলায় দুই লাখ ৬০ হাজার ৮৩৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ ভাগই সুগন্ধি ব্রি ধানের আবাদ। এবারও ভালো ফলনের আশাবাদ কৃষি বিভাগের। দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, দিনাজপুরে মোট আমনের ৪০ ভাগ সুগন্ধি ব্রি ধান ৩৪ এবং ৪০ ভাগ স্বর্ণা বা অন্যান্য জাতগুলোর আবাদ হয়েছে। এ ছাড়াও ১০ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে রয়েছে হাইব্রিড জাতের ধান।
দিনাজপুর সদর উপজেলার শশরা ইউনিয়নের চুনিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন জানান, এবার ফলন অনেক ভালো তবে দাম ভালো পেলেই হয়।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মতে, জেলায় এই মৌসুমে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ ৩৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমি ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল চার লাখ ২৯ হাজার ৭১৬ মেট্রিক টন। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে আরও ১০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে আমনের। লক্ষ্যমাত্রার থেকে আবাদ ও ফলন দুটিই বেশি।

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ৮৫ হাজার ১৪৩ মেট্রিক টন চাউল। আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৬৮ হাজার ৮১ হেক্টর জমি। এর মধ্যে চাষ হয়েছে ৬৬ হাজার ৪৪৬ হেক্টর। সব ধরনের জাতেরই এ বছর ফলন ভালো হয়েছে।

রংপুর ব্যুরো জানায়, চলতি আমন মৌসুমে রংপুর মহানগরসহ আট উপজেলায় হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় মিলে প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। আগের মৌসুমের তুলনায় এবার ২৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ বেড়েছে। বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় এবার সবচেয়ে বেশি ভালো ফলন হয়েছে।
ময়মনসিংহ ব্যুরো জানায়, ময়মনসিংহ জেলায় চলতি আমন মৌসুমে রোপা আমন চাষের জন্য দুই লাখ ৬৮ হাজার ৩২০ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তার মধ্যে আমন ধান রোপণ করা হয় দুই লাখ ৬৮ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে। এ অঞ্চলে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, কৃষি সম্প্রসারণের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ ৯৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে উফশী জাতের এক লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ হেক্টর, স্থানীয় জাতের ২৯ হাজার ৮০ হেক্টর এবং হাইব্রিড জাতের ২৫০ হেক্টর। -তথ্যসূত্র :সময়ের আলো
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here