আমেরিকা গণতন্ত্রের কথা বলে আর খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়

0
22

(দিনাজপুর২৪.কম) বঙ্গবন্ধুর খুনিকে আশ্রয় দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার নিয়ে সমালোচনার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমেরিকা গণতন্ত্রের জন্য কথা বলে আর খুনিদেরকে আশ্রয় দেয়, প্রশ্রয় দেয়। কেন আমি জানি না। তারা নাকি বিশ্বের সব থেকে গণতান্ত্রিক দেশ! গতকাল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বিচার বিভাগ ও বঙ্গবন্ধু অ্যান্ড জুডিসিয়ারি’ শীর্ষক বাংলা ও ইংরেজিতে মুজিব স্মারক গ্রন্থ এবং ‘ন্যায়কণ্ঠ’ শীর্ষক মুজিববর্ষের স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের মূল অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চ্যুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। অ্যাপিলেট ডিভিশনের বিচারপতি এবং স্মারক গ্রন্থ ও স্মরণিকার সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান স্বাগত বক্তৃতা করেন। মুজিব স্মারক গ্রন্থ এবং স্মরণিকার ওপর অনুষ্ঠানে ভিডিও ডকুমেন্টারিও প্রচারিত হয়।

বঙ্গবন্ধু’র পলাতক খুনিদের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনো কয়েকজন খুনি পালিয়ে আছে, তাদেরকেও খোঁজা হচ্ছে। সব থেকে বড়কথা হচ্ছে যে, আমেরিকার মতো দেশ সব সময় ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের কথা বলে, ভোটাধিকারের কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে। কিন্তু আমাদের যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল, আমরা যে ন্যায় বিচার পাইনি- তারপরে যখন বিচার হলো, সেই খুনিদের আশ্রয় দিয়ে বসে আছে। তিনি সরকারে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে যে ক’জন রাষ্ট্রপ্রধান ক্ষমতায় এসেছেন তাদের কাছে খুনিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কথা বলেছেন, অনুরোধ করেছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বারবার বলেছি, একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আপনারা কীভাবে আশ্রয় দেন। আপনাদের জুডিসিয়ারি কীভাবে একজন খুনিকে আশ্রয় দেয়? আমেরিকায় বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ এবং কানাডায় মেজর নূর আশ্রয় নিয়ে আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকলের সুবিচার নিশ্চিত করতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা নিশ্চিত করবে। ন্যায় বিচার মানুষের প্রাপ্য। সব সময়  যেন পায় সেটা আমরা চাই। কারণ আমরা ভুক্তভোগী। তাই আমরা জানি বিচার না পাওয়ার কষ্টটা কী। তিনি বলেন, আমরা যারা ১৫ই আগস্টে সব হারিয়েছিলাম, আমার মতো বাবা মা হারিয়ে যেন কাউকে বিচারের জন্য চোখের পানি ফেলতে না হয়। সেটাই আমরা চাই। সেটা আপনারা নিশ্চিত করে দেবেন। আর আমি যতক্ষণ সরকারে আছি এর জন্য যা যা দরকার আমরা করবো। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে জাতির আজীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বিয়োগান্তক অধ্যায় তুলে ধরে দীর্ঘদিন বিচার না পাবার জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসলে বহু বছর বিচার না পেয়ে মনে অনেক দুঃখ ছিল। যা হোক, এই হত্যার বিচার পেয়েছি। এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় কথা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার রায় কার্যকর হওয়ায় বিচার বিভাগ, দল ও দেশবাসীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, তবে এখন আরেকটা দায়িত্ব রয়ে গেছে। চক্রান্তটা খুঁজে বের করা। এটা একদিন বের হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৯৬ সালে তিনি প্রথম সরকার গঠনের পরই কেবল এদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সেনাছাউনি থেকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার কাজটা তিনি করতে পেরেছেন। পাশাপাশি বিচার বিভাগের অধিকারের জন্য, বিচার বিভাগের উন্নয়নের জন্য এবং দেশের মানুষের উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সরকার ক্ষমতায় না এলে বা তিনি বেঁচে না থাকলে এ দেশে কোনোদিন জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের বিচার হতো কিনা তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, তখন গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার বা মানবাধিকারটা কোথায় ছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না এলে দেশে সেই ইনডেমনিটি বা সেই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই থেকে যেত। বাবার হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইতে মামলা করার জন্য তাকে, তার মতন আপনজনহারাদের ক্ষমতায় আসতে হয়েছে’- উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার বিচার পাওয়ার অধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং আমরা সরকারে আসার পরই এই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। যদিও এই বিচারের রায় দিতে গিয়ে বা বিচার করতে গিয়ে উচ্চ আদালতে অনেকেই সেই সাহসটা পাননি, একটা পর্যায়ে সরে গেছেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের অধিকারের জন্য, বিচার বিভাগের উন্নয়নের জন্য বা দেশের মানুষের জন্য কি করেছি, সেটা আর আমি এত বেশি বলতে চাই না। তবে আমি এইটুকু বলবো যেহেতু আমার বাবা চাইতেন স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, আমরা সরকারে এসে সেই স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। করোনাভাইরাসের মধ্যে বিচার কার্য পরিচালনার জন্য সরকারের ভার্চ্যুয়াল কোর্ট করে দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বিচার কার্য স্থবির হতে পারেনি। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। অন্য সরকারগুলোর মতো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার বিচার বিভাগে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কখনো বিচার কাজে হস্তক্ষেপ করিনি, এর আগে অনেক ঘটনা আছে আপনারা জানেন। দেখা গেছে ফলস সার্টিফিকেটের ব্যবহার বা ছাত্রদলের কাঁধে হাত রেখে কাকে কি রায় দেয়া হবে সেটা নিয়ে আলোচনা। এ রকম বহু ন্যক্কারজনক ঘটনাও বাংলাদেশে ঘটেছে। অন্তত আমি এটুকু বলতে পারি- আমরা সরকারে আসার পর, অন্তত এই পরপর তিনবার এখন আমরা ক্ষমতায় বা এর আগে একবার ছিলাম, আমরা কিন্তু সেটা করার সুযোগ দেইনি। সব সময় একটা ন্যায়ের পথে যেন সবাই চলতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থা করেছি। তিনি বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনারা দেখবেন, একের পর এক আমরা কাজ করে গেছি। দ্বিতীয়বার যখন ক্ষমতায় এসেছি তখন আমরা দি কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৯ পাস করে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কাজটি স্থায়ী রূপ দেই। এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও যেন বিচার বিভাগ স্বাধীনতা অর্জন করে সেই ব্যবস্থাটাও কিন্তু আমি ‘৯৬ সালে এসে করে দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে এসে সব রকম সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। এর মাঝে আপনারা জানেন, বিভিন্ন জেলায় বোমা মেরে বিচারকগণকেও হত্যা করা হয়েছে। সেখানে আমরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সব সময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে। আমাদের দেশটাও যেমন বিশ্বে একটা মর্যাদা নিয়ে চলবে, সঙ্গে সঙ্গে একটি দেশের সমস্ত অঙ্গও যেন সেইভাবে মর্যাদা নিয়ে চলতে পারে- আমরা সেটাই করতে চাই। সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিচারকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারকদের থাকার ব্যবস্থা, তাদের চলার ব্যবস্থা, সব ধরনের ব্যবস্থা, সুযোগ-সুবিধা আমাদের সাধ্যমতো আমি করে দিয়েছি। বিচারকদের দক্ষতা বাড়াতে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আইন কমিশন গঠন করি। বিচারকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আমি প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছি। এখন তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্রেনিং নেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। অন্য দেশে কীভাবে হয় সেটা আমাদের দেশের মানুষের জানা উচিত, সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিয়েছি। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, গ্রামের হতদরিদ্র মানুষ যাতে বিচার পায় সেজন্য লিগ্যাল এইড কমিটি করে তাদের জন্য বিচার প্রাপ্তির ব্যবস্থাটা করে দিয়েছি। জনসাধারণকে আইনগত সহায়তা প্রদানের বিষয়েও সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এনেক্স ভবন করে দিয়েছি। পাশাপাশি প্রত্যেকটা জেলা কোর্ট নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় জনসাধারণের জন্য বিচারের রায় বাংলায় লেখার ওপর পুনরায় গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ইংরেজিতে লেখা বিচারের রায় আসামিরা কি কতটুকু বোঝে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং ইংরেজিতে রায় লেখার সঙ্গে সঙ্গে এটার বাংলায় অনুবাদটা যাতে হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার আহ্বান জানান। এজন্য আলাদাভাবে ট্রান্সলেটর নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। আইন কমিশনের বের করা শব্দকোষ এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও তিনি অভিমত দেন। তিনি বলেন, জাতির পিতা আমাদের স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন। ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছিলাম বাংলাদেশ ডিজিটাল হবে এবং আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হবো। আজকে আমাদের বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ। ২০২১ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ধারাটা দীর্ঘদিন ধরে সেই ২০০৮-এর নির্বাচনের পর ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে বলেই আজকে বাংলাদেশ এই উন্নতি করতে পেরেছে।-অনলাইন ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here