ইউপি নির্বাচনে প্রার্থীকে হুমকি-ধমকি, হামলা : দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই ইসির

0
37

(দিনাজপুর২৪.কম) চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পঞ্চম ধাপের ভোটের আর কয়েক দিন বাকি। প্রার্থী প্রচারে নেমে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। আগের ধাপগুলোতেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। প্রার্থীদের এই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত ভোটের মাঠে সংঘাত-সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত প্রাণ গেছে অন্তত ৭৩ জনের। প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তারা ব্যবস্থা নেন। গত জুন থেকে শুরু হওয়া ইউপি নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের কতটি অভিযোগ কমিশনে এসেছে এবং কতটি নিষ্পত্তি করে শাস্তি দেওয়া হয়েছে সে হিসাব পাওয়া যায়নি। কমিশন বলেছে, গতকাল বুধবার পর্যন্ত চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপ মিলিয়ে তাদের কাছে ২৪২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে সেটা জানাতে পারেনি ইসি।

আচরণবিধি লঙ্ঘন ও হামলা-হুমকির অভিযোগে কয়েকটি ইউপি নির্বাচন বাতিল হতে পারে যা কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব।

কিন্তু এত অনিয়মের মধ্যেও ইসির অভিযোগের অপেক্ষায় থাকার বিষয়টিকে দায়িত্বে অবহেলা বলেই মনে করছেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের প্রকাশ্যে হুমকি-ধমকিসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্প দখলের অভিযোগও উঠছে তাদের বিরুদ্ধে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার চালাতে গ্রামে ঢুকতে না দেওয়া, গত মঙ্গলবার প্রকাশ্য নির্বাচনী সভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের হাতের কবজি কাটার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা দৌলার বিরুদ্ধে। আগের দিন সোমবার রাজবাড়ীর পাংশার কসবামাজাইল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র এক প্রার্থীর কর্মীদের ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে র‌্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে। যদিও র‌্যাব সদস্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একইদিন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউপি নির্বাচনে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মনসুর আহমেদের প্রচার ক্যাম্প দখলের অভিযোগ উঠেছে নৌকার প্রার্থী হাফিজুজ্জামান খানের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে।

হুমকি পাওয়া ও হামলার শিকার প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের নিরাপত্তা চেয়ে অনেক প্রার্থী অভিযোগ দিয়েছেন ইসিতে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রার্থীদের অভিযোগ করতে বলেন আমরা দেখব।’

তৃণমূলের এ নির্বাচনে ইসির প্রতি ‘অনাস্থা’ দেখিয়ে অংশ নিচ্ছে না বিএনপি। দেশের অন্যতম বড় এই দলটি দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় আওয়ামী লীগ এবং দলের বিদ্রোহীরা নিজেরাই সংঘাতে জড়াচ্ছেন। বিএনপি নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অনেক জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কিন্তু ভোটের মাঠে স্বাভাবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে না। আধিপত্যের কারণে বিনাভোটে জয়ের রেকর্ডও হয়েছে এবার। পঞ্চম ধাপ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারের বেশি জনপ্রতিনিধি বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। ৩৫৩ ইউপিতে চেয়ারম্যান পদে ভোটের প্রয়োজন হয়নি।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার গণমাধ্যমকে বলেন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনকে উৎসাহিত করা সম্ভব নয়, সমীচীনও নয়। আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে, নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করলে এ অবস্থা থেকে আমরা উদ্ধার পেতে পারি কি না।’

গতকাল স্থানীয় সরকার বিশেজ্ঞ বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব তো সুষ্ঠু  নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। যেসব বিষয় এই সুষ্ঠু নির্বাচনকে ব্যাহত করে সেগুলো যাতে না ঘটে এটাই তাদের দায়িত্ব। পক্ষপাতদুষ্ট অযোগ্য নির্বাচন কমিশন নিয়োগ করলে তাই হয়।’ তিনি বলেন, ‘যারা হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, সহিংসতা করছে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। যে প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে এসব করা হচ্ছে তাদের প্রার্থিতা বাতিলেরও বিধান আছে। এরপরও যদি বেসামাল হয় নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। নির্বাচনে অনিয়ম সহিংসতা হলে তা বাতিল করতে পারে তদন্ত সাপেক্ষে। নির্বাচন কমিশন যদি তাদের ক্ষমতা ব্যবহার না করে এগুলো তো হবেই। অন্যায় করে যদি পার পাওয়া যায় তাহলে অন্যায় উৎসাহিত হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, ‘যেসব অভিযোগ আসছে সেগুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না। প্রার্থিতা বাতিলের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ অভিযোগে তদন্তের প্রয়োজন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ তো পেলেই হয় না; তদন্ত করে তারপর আমরা ব্যবস্থা নেব। একটি অভিযোগ তদন্ত হয়ে আসতে ৩ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত লাগে।’

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে সমানাধিকারের কথা বলা আছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী যে কোনো প্রার্থী সমান অধিকারের সুযোগ পাবে। রাজনৈতিক দল, কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান পথসভা বা ঘরোয়া শোভাযাত্রা ছাড়া জনসভা করতে পারবে না। এছাড়া নির্বাচনী ক্যাম্প এবং অফিস স্থাপনেও বিধিনিষেধ রয়েছে।

ইউপি নির্বাচন আচরণ বিধিমালা ২০১৬ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনের আগে এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে ছয় মাসের কারাদ- বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবে। এছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো প্রার্থীর পক্ষে কোনো সংস্থা এই বিধিমালা লঙ্ঘন করলে অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদ-ে দ-িত হবে।

ইসির দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যত্যয় ঘটছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম গতকাল বলেন, ‘আমরা তো এখানে থেকে কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারব না। ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের দায়িত্বটা যাদের ওপরে দেওয়া আছে। তাদের ওপরে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখে তার যদি সত্যতা থাকে তাহলে অবশ্যই আমরা অ্যাকশন নেব।’ -অনলাই ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here