কেরানীগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্প: ২২ ঘরের ১৭টিতেই তালা!

0
51
(দিনাজপুর২৪.কম) দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোণ্ডা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বক্তারচর গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রবেশ পথেই দেখা হয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী ফারজানা হকের সঙ্গে। স্বাস্থ্য সচেতনতার কাজে প্রতি মাসে একাধিকবার এখানে আসেন তিনি কিন্তু এখানে তেমন কোনো মানুষজনের দেখা পান না। বেশিরভাগ ঘরই তালাবদ্ধ থাকে।
ফারজানা হক জানান, যতবারই এসেছেন দুই থেকে তিনটি ঘরের বেশি খোলা পাননি। ঘুরে-ফিরে পাঁচ ঘরে মানুষ পেয়েছেন। বাকি ১৭টি ঘর বরাবরই তালাবদ্ধ দেখেছেন তিনি। একটু ভেতরে গিয়েই ফারজানার কথা হুবহু মিলে গেল। মাত্র চারটি ঘরে মানুষ বসবাস করছে। আরও একটি ঘরে মানুষের বসবাসের আলামত দেখা গেছে। এসব ঘরের সামনে সবজি বাগানও রয়েছে।
স্থানীয়রাও জানিয়েছেন মূলত এই পাঁচটি পরিবারই এ আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। বাকি ১৭টি ঘরে কখনো কাউকে থাকতে দেখেননি তারা। এই ১৭ ঘরের মধ্যে দুটি ঘরে প্রকল্পের মালামাল রাখা হয়েছে। বাকি ঘরগুলো উদ্বোধনের পর থেকেই তালাবদ্ধ। অনেক ঘরের চালে এরই মধ্যে মরিচা ধরে গেছে। অথচ ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের আবাসন নিশ্চিতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সারা দেশে আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, যাদের ঘর প্রয়োজন, তারা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চলে এসেছেন। প্রথমদিকে এখানে থাকতে অনেক ভয় লাগত। তবে সেই ভয়কে জয় করে এখানে দুটি পরিবার বসবাস শুরু করেছে। সব ঘরেই মানুষ থাকেন-প্রথমদিকে এমন দাবি করলেও নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে পরে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারাও স্বীকার করেন এখানে পাঁচটি পরিবার ছাড়া কেউই থাকেন না। এসব ঘর কারা পেয়েছেন তাও বলতে পারছেন না কেউ। কোনো দিনও বাকি ঘরগুলোর মালিকদের দেখা পাননি তাদের কেউ। বরাদ্দের পর এসব ঘর কাউকে খুলতেও দেখেননি।
তাদের ভাষ্য, সরকার আমাদের ঘর দিয়েছে। আমরা সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। এখনে কে এলো আর কে এলো না তা আমাদের বিষয় না। তাদের একজন জানান, এখানে কেউ থাকলে তো অবশ্যই আমরা দেখতাম। যেসব পরিবার এখানে বসবাস করছে তাদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কথা হচ্ছে। আমরা পাঁচ ঘরের বাসিন্দারা সবাই এক পরিবারের মতো।

অন্য একজন বলেন, এখানে কথা বললে অনেক ধরনের সমস্যা আছে। আমরা মাত্র কয়েকটি পরিবার থাকি। অনেক সময় আতঙ্ক ও ভয়ও কাজ করে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখনও অনেক ঘরের কাজ সম্পন্ন হয়নি। তাই ঘরে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে কিন্তু সরেজমিন ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। দেড় বছর আগে বরাদ্দ দেওয়া অনেক ঘর এখনও তালাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে। নতুন যে ঘরগুলোর কথা বলা হচ্ছে, অন্তত ছয় মাস আগে সেগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে ঘর বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকা এবং ফোন নম্বর চেয়েও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, সব ঘর বরাদ্দ দেওয়া শেষ হলে একসঙ্গে তালিকা দেবেন। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে কুসুম এবং শাহনাজ নামে দুজনের নাম ও ফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়। যারা ঘর বরাদ্দ পেয়েও আশ্রয়ণ প্রকল্পে থাকছেন না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মধ্যে শাহনাজের নাম্বারে পরপর তিন দিন কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সরেজমিন দেখা গেছে, নতুন বক্তারচর গ্রামের একটি চরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ঘরগুলোর পাশেই ছোট সড়ক। এই সড়ক থেকে নেমে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঢুকলে হাতের ডান পাশে পাঁচটি ঘর দেখা যায়-যার সবই পুরোনো। এই সারির পাঁচটি ঘরের মধ্যে একটি ঘরে পরিবার পাওয়া গেছে। বাকি চারটির মধ্যে দুটিতে রয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মালামাল। আরও একটি ঘরে মানুষ বাস করে বলে জানান স্থানীয়রা। অন্য একটি ঘর বরাদ্দের পর থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখছেন সবাই। এ ঘরটি কুসুম নামের একজন পেয়েছেন বলে জানা গেছে। একটি সূত্র থেকে পাওয়া কুসুমের মোবাইল ফোন নম্বরটি একাধারে তিন দিন বন্ধ পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ পাশের সারির ঘরগুলোর মধ্যে তিনটি ঘরে তিনটি পরিবার বসবাস করছে। সড়কের পাশে একটি ঘর বেশ গোছানো দেখে মনে হলো, এখানে হয়তো কোনো পরিবার বসববাস করছেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল সরকারি কর্মকর্তারা এলে এ ঘরে বসেন। যারা বরাদ্দ পেয়েছেন তারা আসেননি। এরপর একটি ঘরে তালা দেওয়া। পরের দুটি ঘরে দুটি পরিবার বসবাস করে। এ সারির শেষ প্রান্তের ঘরে একটি পরিবার রয়েছে। তা ছাড়া বাকি সব ঘরই ফাঁকা পড়ে আছে।
বরাদ্দপ্রাপ্ত বেশ কিছু পরিবার আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে এখনও আসেনি বলে স্বীকার করেছেন কেরানীগঞ্জ ইউএনও মেহেদী হাসান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনেকেই আগে থেকে বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া থাকছেন। সেখানে তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। স্কুল পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে তাদের আসতে দেরি হচ্ছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা একটা সময় পর্যন্ত দেখব। এরপরও যদি কেউ না আসে, তবে তাদের নোটিস দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বরাদ্দ বাতিলের প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।’
কেরানীগঞ্জের কোণ্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান চৌধুরী ফারুক বলেন, ‘আমরা এসব ঘর দেওয়ার জন্য কমিটির মাধ্যমে তালিকা তৈরি করেছি। সেই তালিকা যাচাই-বাছাই করেই ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে কয়েকটি ঘরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে দুয়েকটি পরিবার অনুপস্থিত থাকতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘর বরাদ্দ পেয়েও যদি এখানে কেউ না থাকে-তবে তার কারণ তারাই বলতে পারবে।’ -ডেস্ক রিপোর্ট
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here