খেলাপি ঋণ ও রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ আইএমএফের

0
58

(দিনাজপুরব্যাংক খাতের উচ্চখেলাপি ঋণ নিয়ে ফের উদ্বেগ প্রকাশ করে তা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা জানতে চেয়েছে .কম) আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একইসঙ্গে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি বৃদ্ধি এবং চাপের মুখে থাকা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি পরিবর্তনের অগ্রগতি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে আইএমএফ। ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, প্রধান অর্থনীতিবিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে এসব বিষয় জানতে চান সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। বাংলাদেশকে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এসব বৈঠক করেন।
এদিকে আইএমএফের সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিষয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের এক্সটেনডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি, র‌্যাপিড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি ও র‌্যাপিড ফাইন্যান্সিং ইনস্ট্রুমেন্ট চুক্তি
আছে। নিয়মিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আইএমএফ মিশন এখন বাংলাদেশ সফর করছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হচ্ছে। সংস্থাটির সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণের বিষয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যেই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বাজেট সহায়তা হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে এই ঋণ নিতে চাইছে সরকার। এক্সটেনডেড ক্রেডিট ফ্যাসিলিটি (ইসিএফ), এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি (ইএফএফ) ও রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাস্টেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) কর্মসূচির আওতায় দেড় বিলিয়ন করে এই ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী সরকার।
এই ঋণের বিষয়ে আলোচনা করতে গত বুধবার ১৫ দিনের সফরে ঢাকায় আসে সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল। এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাহুল আনন্দ। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিনিধি দলটির দিনভর বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে টাকা ও ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ, সঞ্চয়পত্র খাতে সংস্কার, বন্ড বাজারের উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টায় গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে বৈঠক হয় আইএমএফ প্রতিনিধি দলের। এতে চার ডেপুটি গভর্নর ও প্রধান অর্থনীতিবিদ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আইএমএফ মিশনের কার্যক্রম ও পরিকল্পনা নিয়ে ৩০ মিনিটের একটি উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়, যেখানে আইএমএফের ঋণের বিষয়টিও উঠে আসে। এ সময় রিজার্ভ সাশ্রয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপ এবং রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি পরিবর্তনের অগ্রগতি জানতে চায় প্রতিনিধি দলটি। একইসঙ্গে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ও খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়।
এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। এ বৈঠকে সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ, বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন, সঞ্চয়পত্র খাতের সংস্কার, ঋণের সুদের হারসহ মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার কয়েক দফা কমানোর পরও ঋণের সুদের সীমা দিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এতে প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। তাই অর্থনীতির স্বার্থেই নীতি সুদহার তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। এ ছাড়া বৈঠকে টানা ডলার বিক্রির কারণে অব্যাহতভাবে দেশের রিজার্ভ কমে যাওয়া নিয়েও সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়েছে, এভাবে রিজার্ভ কমতে থাকলে তা দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলতে পারে।
এরপর দুপুর ২টায় ডেপুটি গভর্নর কাজি ছাইদুর রহমান ও একেএম সাজেদুরের সঙ্গে বৈঠক করে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। এ বৈঠকে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া বহিঃখাতের ঋণপ্রবাহ এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং রপ্তানি খাত ও বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ পরিস্থিতিও জানতে চাওয়া হয়। এ সময় আইএমএফ প্রতিনিধি দলকে জানানো হয়, তাদের ম্যানুয়াল অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতি নিয়ে আগে থেকেই আপত্তি রয়েছে আইএমএফের। সংস্থাটির ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন (বিপিএম-৬) ম্যানুয়াল অনুযায়ী, কোনো দায় রিজার্ভ হিসেবে বিবেচিত হবে না। বিশেষ করে রিজার্ভের অর্থে গঠিত ইডিএফসহ বিভিন্ন ঋণ তহবিল, যেগুলো নন লিকুইড সম্পদ, সেটি রিজার্ভ থেকে বাদ দিয়ে হিসাব করার কথা বলে আসছে আইএমএফ। এভাবে হিসাব করলে বর্তমানে প্রকৃত রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসবে।
খেলাপি ঋণ নিয়ে আইএমএফ উদ্বেগ জানানোর কারণ, বিভিন্ন ছাড় এবং করোনা পরিস্থিতি উন্নতির পরও ব্যাংক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। এটি এ খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ছয় মাস আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলে ছয় মাসের ব্যবধানেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। -সূত্র : আমাদের সময়

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here