গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব

0
80

(দিনাজপুর২৪.কম) আবাসিক ও বাণিজ্যিকসহ সব খাতে গ্যাসের দাম বাড়াতে মূল্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) চিঠি দিয়েছে ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। তারা গড়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ভর্তুকি সামাল দিতে সরকার গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে কোম্পানিগুলো চিঠি দিয়েছে।

আবাসিকের ক্ষেত্রে দুই চুলায় ৯৭৫ থেকে বাড়িয়ে ২১০০ টাকা, মিটার আছে এমন চুলায় প্রতি ঘনমিটার ১২ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ২৭ টাকা ৩৭ পয়সা করতে চায় কোম্পানিগুলো। তিতাসসহ এই ছয়টি কোম্পানি সরাসরি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিইআরসি বলেছে, আইন অনুযায়ী সরাসরি প্রক্রিয়ায় দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। নির্ধারিত ছকে প্রস্তাব দিতে হবে। এরপর গণশুনানি করে দাম বাড়ানোর আদেশ দেওয়া হবে।

বিইআরসিকে দেওয়া কোম্পানিগুলোর চিঠি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তিতাস গ্যাস, বাখরবাবাদ, পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস কোম্পানি, সুন্দরবন, কর্ণফুলী ও জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে চিঠিতে বলেছে, বাসাবাড়িতে দুই চুলার গ্যাসের দাম হতে হবে ২১০০ টাকা, বর্তমানে এ দাম আছে ৯৭৫ টাকা। এক চুলার গ্যাসের দাম ৯২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে করতে হবে ২ হাজার টাকা। আর মিটার আছে এমন চুলায় প্রতি ঘনমিটার ১২ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ২৭ টাকা ৩৭ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে সরকারের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো।

বিতরণ কোম্পানিগুলো বলেছে, যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির প্রতি ঘনমিটার কমিশন ছাড়া দাম ৭৬ টাকা ৪৮ পয়সা করতে হবে। বর্তমানে এ দাম ৩৫ টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার বর্তমানে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা করতে হবে। শিল্পকারখানার নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে উৎপাদিত ক্যাপটিভ পাওয়ারের গ্যাসের দাম ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার জন্য বলেছে কোম্পানিগুলো। শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের গ্যাসের দাম ১৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৩৭ টাকা ২৪ পয়সা, চা শিল্পের গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা করার জন্য বলা হয়েছে। সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ২৩ টাকা থেকে ৪৯ টাকা ৯৭ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।

বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ৩৬ পয়সা। দাম বাড়িয়ে ২০ টাকা ৩৫ পয়সা করতে চায় বিতরণ কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ ১১৭ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে কোম্পানিগুলো।

গত বছরের নভেম্বরে খুচরা পর্যায়ে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় সরকার। তখন সরকারের দাবি ছিল, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ডিজেলে লিটার ১৩ দশমিক ০১ টাকা এবং ফার্নেস অয়েলে লিটার প্রতি ৬ দশমিক ২১ টাকা কমে বিক্রি করায় প্রতিদিন ২০ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। গত অক্টোবর মাসেই ৭২৬ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১৬ সালের এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সারা দেশে এ নিয়ে হইচই শুরু হয়। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাসের দাম বাড়ালে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, ফলে বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিল্পের গ্যাসের দাম বাড়লে পণ্যের দামও বাড়বে, ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। ওই সময় দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতার বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ জ্বালানি সহকারী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম বলেছিলেন, ‘যে হারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজির) দাম বেড়েছে তাতে সরকারের বড় ভর্তুকি যাচ্ছে এই গ্যাস আমদানি করতে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মনে রাখা দরকার, কতটুকু বাড়াতে পারবে সরকার। গোটা লোকসান জনগণের কাছ থেকে নেওয়া যাবে না। এ খাতে অবশ্য ভর্তুকি থাকতে হবে। এ দুটি প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অধিক হারে বাড়লে তা জনগণের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’

এলএনজি আমদানিই বিপাকে ফেলেছে সরকারকে : গত ২৮ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় উপস্থিত থাকা কর্মকর্তারা বলেছেন, সার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জন্য চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) ৭০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন। এই ভর্তুকির বিপরীতে সরকারের চলতি বছরের বাজেটে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ রয়েছে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় দুই হাজার কোটি টাকা জ্বালানি বিভাগকে দিয়েছে। এলএনজি আমদানি করতে সরকারের এখনই দরকার ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই বরাদ্দও যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ। সে কারণে গত নভেম্বরে অর্থ বিভাগের কাছে ৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দিয়েছে তারা।

এরপরই শুরু হয় গ্যাসের দাম বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক তৎপরতা। গত ৩ জানুয়ারি জ্বালানি বিভাগ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসিতে পাঠানোর জন্য পেট্রোবাংলাকে নির্দেশনা দেয়। গত ৫ জানুয়ারি পেট্রোবাংলা গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে দেশে এলএনজি আমদানিতে কী ধরনের ব্যয় ও লোকসান হচ্ছে তার একটা হিসাব পাঠিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আবেদন করতে বলে বিইআরসির কাছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো বিইআরসির কাছে সরাসরি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির দাবি জানায়। বিইআরসির পরিচালক ও সচিব মো. রেজাউল করিম খান গত ১৩ জানুয়ারি গ্যাস বিতরণ কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে জানায়, এভাবে আবেদনের ভিত্তিতে সরাসরি গ্যাসের দাম বাড়ানোর সুযোগ আইনে নেই। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব কমিশনে যথাযথ পদ্ধতিতে পাঠাতে হবে। এরপর এটা নিয়ে গণশুনানির পর দাম বাড়ানোর বিষয়ে কমিশন ৯০ কার্য দিবসের মধ্যে আদেশ দেবে।

কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, অন্যান্যবারের মতো এবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হবে না। গণশুনানি শেষ করার অল্প কয়েক দিনের মধ্যে দাম বাড়ানোর আবেদনের বিষয়ে আদেশ দেওয়া হবে।

দেশে এখন গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪২০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ করা হয় প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আকারে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। পেট্রোবাংলার প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিসিএল) এলএনজি আমদানির দায়িত্বে রয়েছে। বিইআরসিতে পাঠানো পেট্রোবাংলার হিসাবে বলা হয়েছে, প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানি ব্যয় বাবদ খরচ হচ্ছে ৫০ টাকা ৩৮ পয়সা। অথচ দেশে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ৯ টাকা ৩৬ পয়সা।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজির দাম গত বছরের আগস্টের আগে ছিল ১০ ডলার। সেটি বেড়ে এখন ৪৫ ডলার হয়েছে। সাড়ে চারগুণ দাম বেড়েছে এলএনজির স্পট মার্কেটে। -সূত্র :দেশ রূপান্তর

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here