চালের বাজারে সব উদ্যোগই ব্যর্থ

0
24
(দিনাজপুর২৪.কম) চালের কষ্ট আর দূর হলো না দেশের ভোক্তার। গত তিন বছর ধরে প্রধান এ খাদ্যপণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় কষ্টের শেষ নেই মানুষের। চালের দাম কমাতে আমদানির অনুমতি দেওয়া, শুল্ক কমানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে সরকার। তবে সব উদ্যোগ ব্যর্থ করে দিয়ে চালের মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়া ছুটেই চলেছে। কিছু দিন স্থিতিশীল থাকার পর এ সপ্তাহে আবার নতুন করে অস্থির হয়ে উঠেছে চালের বাজার।
পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা আর খুচরা বাজারে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। এই দফায় দাম বৃদ্ধিতে নাজিরশাইল চালের দামে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। এই চিকন চালটির কেজি এখন ৯০ টাকা। আরেক চিকন চাল মিনিকেটের কেজি ঠেকেছে ৭৫ থেকে ৭৮ টাকায় এবং মোটা চালের কেজি এখন ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা।  এমনিতেই আগে থেকে চালের বাজার অনেক চড়া, নতুন করে আরও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের দিশেহারা অবস্থা। নিম্ন আয়ের অনেক মানুষ এখন খাওয়া কমিয়ে জীবন ধারণ করছে। কারণ চড়া মূল্যের বাজারে ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সঙ্কুলান হচ্ছে না।
রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসহ কয়েকটি বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে প্রায় সব ধরনের চালের দাম। প্রতিকেজি মিনিকেট চাল মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৭৬ টাকায়। তিন-চার দিন আগেও এর দাম ছিল ৭২ থেকে ৭৩ টাকা। কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। আর এক বস্তা চাল ৪ হাজার ২৫০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
বিআর২৮ জাতীয় চাল কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৫৮ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর এক বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। আর মোটা চালে কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায়। এদিকে সপ্তাহ ব্যবধানে পাইকারিতে মোটা চাল ৫০ কেজির বস্তায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিনিকেটের দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা পর্যন্ত। পাইকারিতে এখন মোটা চাল বি২৮ ও পাইজাম ৫০ কেজির বস্তা ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০, চিকন চাল মিনিকেট বস্তাপ্রতি দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ এবং নাজিরশাইল ৫০ কেজির বস্তা ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের জননী রইস এজেন্সির মালিক হাবিবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, গত কোরবানির ঈদের আগে থেকে চালের বাজার চড়া মূল্যেই এক রকম স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সপ্তাহখানেক ধরে আবার চালের দাম বাড়ছে। আমরা যতটা জানতে পারছি মিল পর্যায়েই চালের অনেকে বেড়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে, আজ যে রেটে চাল কেনার অর্ডার দিচ্ছি, পর দিন দিতে গেলা দেখা যাচ্ছে বস্তায় ৫০ টাকা বেশি চাওয়া হচ্ছে। তার মানে এখন প্রতিদিনই মিল পর্যায়ে চালের দাম বাড়ছে। তার প্রভাব পড়ছে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে।
এদিকে চালের বাজারে খোঁজ নিয়ে এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে চালের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান তিনটি কারণ রয়েছে। এগুলো হলো- ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম হওয়ায় চাল আমদানি কম হচ্ছে। ডলারের দাম বেশি হওয়ায় চাল আমদানি মূল্য বেশি পড়ছে এবং আমনের শেষ মৌসুম হওয়ায় ধানের দাম বেশি হয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় কারণ হলো- সরকার প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিলেও ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত চাল আমদানি করছেন না, এমনকি চাল আমদানিতে তাদের আগ্রহও কম। কারণ বিশ্ববাজারেও চালের দাম এখন বেশি। ফলে যে দামে আমদানি করা হচ্ছে সে দাম দেশের বাজারে দামের কাছাকাছি। তাই আমদানি করা চাল বাজারে তেমন কোনো প্রভাব ফেলছে না। তা ছাড়া ডলারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেশি হচ্ছে- এজন্যও চাল আমদানিতে অনীহা ব্যবসায়ীদের।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়ার খাজানগরের চাল ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক গোলাম মোস্তফা গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেই মোটা চাল আমদানিতে এখন প্রতি টনের দাম ৫০০ ডলারের ওপরে। অর্থাৎ প্রতিকেজি মোটা চালের আমদানি খরচই পড়ছে ৫০ টাকা। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, শুল্ক, বন্দর চার্জ, লেবার খরচসহ সব ব্যয় ধরলে ১ কেজি আমদানিকৃত চালের দাম ৫৫ টাকার ওপরে পড়ে। দেশের বাজারেও মোটা চাল একই রকম দামে বিক্রি হচ্ছে। তা হলে একই দামের চাল আমদানি করে দেশের বাজারে দাম কমাতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে। বাস্তবেও তাই হচ্ছে। চড়া মূল্যের কারণে আমদানিকৃত চাল বাজারে কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, পাশাপাশি ডলারের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় চাল আমদানিতে এখন বেশি টাকা লাগছে। এই চড়া ডলার দিয়ে চাল আমদানি করে পোষানো যাচ্ছে না। এজন্য চাল আমদানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কম।
কাজে আসছে না সরকারি উদ্যোগ : দেশের বাজারে বাড়তে থাকা চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি উদ্যোগ কাজে আসছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিদফতরের অভিযান, আমদানির অনুমতি, শুল্ক হ্রাসসহ সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন চালের বাজার। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের আমদানিতে আগ্রহ কম। দেশে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে এরই মধ্যে ভারত থেকে ১২ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু বাজারে চালের দাম না কমে উল্টো বাড়তে শুরু করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য সচিব মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, কোন বন্দর দিয়ে কত টন চাল আমদানি হয়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমদানির পুরো তথ্য পাওয়া সময়সাপেক্ষ। চালের দাম বাড়ার কোনো খবর আমাদের কাছে নেই। আমাদের লোক দিয়ে প্রতিদিন বাজার দর মনিটরিং হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। হয়তো স্থানভেদে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা হেরফের হতে পারে। তিনি আরও বলেন, সরকার প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। একই সঙ্গে শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে। এ পর্যন্ত ৫ লাখ টন চাল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে। আমরা আগস্টের ১২ তারিখ পর্যন্ত এলসি খোলার সময়সীমা বাড়িয়েছি। আশা করছি আরও ৫ লাখ টন এলসি খোলা হবে। সর্বোপরি আমাদের সরবরাহ চেইন ভালো আছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই।
চালের মজুদ ১৫ লাখ টন হলেও জোর নেই ওএমএসে : এদিকে সরকারি গুদামে এখন প্রায় ১৫ লাখ টন চাল মজুদ রয়েছে (১৪ লাখ ৮৯ টন)। এ ছাড়া গতকাল রোববার পর্যন্ত ধান-গমসহ মোট খাদ্য মজুদ রয়েছে ১৭ লাখ ৩১ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ছাড়াও ১ লাখ ৫৭ হাজার টন রয়েছে গম এবং ধান মজুদ রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩২ হাজার টন। খাদ্যশস্যের মজুদ ভালো থাকলেও খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে চাল বিক্রি কার্যক্রম খুব বেশি হচ্ছে না। এই সঙ্কটকালে ওএমএস কার্যক্রম আরও বেশি আকারে চালু করার পরামর্শ বাজার বিশ্লেষকদের।
এ বিষয়ে কনজু্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সময়ের আলোকে বলেন, ‘চালের বাজারের দিকে সরকারের গুরুত্ব কম, নজরদারিও কম। তা না হলে টানা তিন বছর দেশের মানুষ চালের দামে কষ্ট পাচ্ছে; কিন্তু সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। সরকার ওএমএস কার্যক্রমও এখন অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছে। চালের মজুদ তো ভালো, তা হলে সারা দেশে ব্যাপক হারে ওএমএস কার্যক্রম চালু করতে সমস্যা কোথায়। এতে বাজারে চালের দাম কমাতে সাহায্য করে।
উল্লেখ্য, চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য ৬২ শতাংশ থেকে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৩০ জুন থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় ৩৮০টি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ৯ লাখ টনের বেশি চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। -সূত্র : সময়ের আলো
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here