জনশুমারিতে গায়েব দুই তৃতীয়াংশ মানুষ!

0
65
(দিনাজপুর২৪.কম) দেশের ষষ্ঠ ও ডিজিটালি প্রথম ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-কে একটি সফল শুমারি বলছে সরকার। সব ধরনের ভুলত্রুটিমুক্তও দাবি করা হচ্ছে। আর ডিজিটালি করায় আরও দ্রুত তথ্য দেওয়াকে বড় অর্জন মনে করা হচ্ছে। তবে অনেকেরই অভিযোগ, জনশুমারি থেকে তারা বাদ পড়েছেন। গণনাকারীরা অনেক ক্ষেত্রে বাসায় যাননি। অনেক বাসায় না গিয়েও বাইরের দরজায় ‘গণনা হয়ে যাওয়ার স্টিকার’ লাগিয়ে দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে অভিযোগ করছেন অনেকে। এদিকে সদ্যসমাপ্ত জনশুমারির তথ্যের সঙ্গে মিল নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যার তথ্যের।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ২০১৯-২০ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাদের জনসংখ্যা ৬১ লাখ। কিন্তু সম্প্রতি শেষ হওয়া ডিজিটাল জনশুমারির প্রাথমিক তথ্য বলছে, ঢাকা উত্তরের জনসংখ্যা ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কম। আবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, তাদের জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। আর জনশুমারি বলছে, এ সিটির জনসংখ্যা মাত্র ৪২ লাখ ৯৯ হাজার। এ হিসাবে দেখা যায়, আগের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ গণনায় আসেনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আখতার মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেন, ডিএসসিসির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, শুধু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই ৭৫টি ওয়ার্ডে ২০২০ সালে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। অথচ বর্তমান জনশুমারি অনুযায়ী বিবিএস বলছে, মাত্র ৪২ লাখ ৯৯ হাজার। বিবিএস তাদের হিসাবে দুই সিটি করপোরেশনে নতুন করে সংযুক্ত ওয়ার্ডগুলো বিবেচনা করেছে তো?
এ বিষয়ে জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ প্রকল্পের টিম লিডার দীপঙ্কর রায় সময়ের আলোকে বলেন, ঢাকা দক্ষিণের ভোটার দেখেন কত আর জনসংখ্যা কত। সেটা দেখলেই বুঝতে পারবেন। তারা যে ১ কোটি ২০ লাখ লিখেছে, সেটা ঠিক নয়। সেই তথ্য তারা কোথায় পেয়েছে জানি না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটেই দেখা যায়, ২০২০ সালের নির্বাচনের তথ্য অনুযায়ী তাদের মোট ভোটার মাত্র ২৪ লাখ ৫৩ হাজার। দীপঙ্কর রায় বলেন, ২৪ লাখ ভোটার থেকে কোনো সমীকরণেই জনসংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ হবে না।
তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বেশিরভাগ বাণিজ্যিক এলাকা। অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে আসেন আবার রাতে চলে যান। তারা কেউই সেখানে থাকেন না। যারা সেখানে থাকেন তাদেরই গণনায় আনা হয়েছে। ওই এলাকায় দিনে অনেক মানুষ দেখা যায়। তাই মনে হয়, মানুষ অনেক বেশি। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই বাণিজ্যিক কাজে আসেন।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু নাসের বলেন, ২০১১ সালে দক্ষিণের ৫৫ ওয়ার্ডের জনসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার। এরপর আরও ২০টি ওয়ার্ড বেড়েছে, পাশাপাশি জনসংখ্যাও বেড়েছে। সে অনুযায়ী প্রক্ষেপণ করে ১ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার তথ্য দেওয়া হয়। আর ভোটারের কথা যে বলছেন, সেই বিষয়ে বলব, অনেকেই এখানে থাকেন; কিন্তু এখানকার ভোটার না। তবে কোন তথ্য ঠিক আর কোন তথ্য ভুল সেটা আমি বলতে পারব না।
এদিকে মতিঝিলের বাসিন্দা সাইফুল্লাহ আমান বলেন, জনশুমারি হয়ে গেল, আমাদের তো কেউ গুনল না। আমরা কি দেশে নেই। আমাদের বাসায় কেউ গণনা করতে আসেনি।
মিরপুরের মনিপুরের বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের বাসায় কেউ গণনা করতে আসেনি। আমাদের বিল্ডিংয়ের চারটি ফ্লোরে ৮টি ফ্ল্যাট। কিন্তু কেউই এখানে গণনায় আসেনি। এদিকে বাড্ডার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের বাসায় স্টিকার লাগিয়ে গেছে; কিন্তু তথ্য নেয়নি।
এ বিষয়ে জনশুমারি প্রকল্পের টিম লিডার বলেন, অনেকেই আমাদের কাছে অভিযোগ করেছেন। বাসায় গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে যিনি অভিযোগ করেছেন তার একজন ঘরের সদস্যের থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি জানেন না। এমন অনেক ঘটনাই হয়। অনেক বাসার মহিলার থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে; কিন্তু পুরুষ সে বিষয়টি জানেন না বা তাকে জানানো হয়নি। তাই তিনি অভিযোগ করছেন। জনশুমারি এমন নয় যে, যার তথ্য তার থেকেই নিতে হবে। পরিবারের একজনের থেকে নিলেই হলো।
তবে যারা অভিযোগ করেছেন তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাইরে অভিযোগ না করে, আমাদের কাছে করুন। আমাদের ৪০ জন লোক বসিয়ে রেখেছিলাম হটলাইনে। তারা অভিযোগ করলেই তো নিয়ে নিত। দেশের নাগরিক হিসেবে সবারই তো একটা দায়িত্ব আছে।
এদিকে বুধবার ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, জনশুমারি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করা হয়েছে। তবু আমাদের ভুল থাকতেই পারে। আপনারা সেটি দেখিয়ে দিন। আমরা সংশোধন করব। জনশুমারি থেকে পাওয়া তথ্যের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। এসব তথ্যের অনেক কমার্শিয়াল ভ্যালু আছে।
এদিকে অনেকেই গণনায় না আসার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম নূর-উন-নবী বলেন, আমরা অনেক সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ভিড় দেখে মনে করি জনসংখ্যা তো ১৮ থেকে ২০ কোটি হবেই। কিন্তু এখন দেশে মাঠ পর্যায়ে কাউন্ট করে যে তথ্য পেয়েছে সেটাই তারা বলছে। এখন গণনার পর বিআইডিএস আবার ক্রস চেক বা আবারও জরিপ করবে। তারা একটা জরিপ করে এ জনশুমারি কতটা সঠিক হয়েছে তা এবং এর ত্রুটির মাত্রা পরিমাপ করে একটা ফিগার দেবে। সেটাই হবে আমাদের ফাইনাল জনসংখ্যা।
এবার যে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আমাদের শুমারি হয়েছে তাতে ত্রুটির মাত্রা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। তাই যে সংখ্যা দেওয়া হয়েছে তা থেকে খুব বেশি বাড়বে না।
বুধবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬ জন।
এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা আট কোটি ১৭ লাখ ১২ হাজার ৮২৪ জন, নারীর সংখ্যা আট কোটি ৩৩ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী ১২ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণের জনসংখ্যা ৪২ লাখ ৯৯ হাজার এবং ঢাকা উত্তরের জনসংখ্যা ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার। তথ্যসূত্র-সময়ের আলো
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here