টিসিবির পণ্য বিক্রি: প্রথম দিনেই অনিয়ম নানা অভিযোগ

0
21
ছবি-সংগ্রহীত
(দিনাজপুর২৪.কম) ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গতকাল মঙ্গলবার থেকে পণ্য বিক্রি শুরু করেছে সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি। তবে প্রথম দিনেই নানা রকম অনিয়ম দেখা গেছে সারা দেশে পণ্য বিক্রির সময়। কোথাও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নিয়ে কার্ড দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, কোথাও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে, কোথাও দেওয়া হয়েছে পচা পেঁয়াজ। আবার কোথাও পণ্য দেওয়া হয়েছে চাহিদার তুলনায় কম। আবার কোনো জায়গায় ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। কার্ড নিয়ে বেশ সুশৃঙ্খলভাবে হাসিমুখে টিসিবির পণ্য নিয়ে ঘরে ফিরতেও দেখা গেছে অনেককে। গতকাল রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
গতকাল সকাল ৯টার দিকে রাজধানীর কলেজগেট এলাকায় টিসিবির পণ্য বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি নিজের হাতে বেশ কয়েকজন ক্রেতার হাতে পণ্য তুলে দিয়ে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। বাণিজ্যমন্ত্রী যেখানে উদ্বোধন করেন সেখানেই অভিযোগ ওঠে ফ্যামিলি কার্ড টাকার বিনিময়ে দেওয়ার। এখানে পণ্য  নিতে আসা অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেন, ওয়ার্ড কমিশনারের কার্যালয়ে কার্ড নিতে গেলে কার্ডপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।

পণ্য বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রীর নজরে আনলে তিনি বলেন, ‘এ রকম অভিযোগ আমার জানা নেই। তবে আপনারা যেহেতু বলেছেন, আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’

আগে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করা হলেও শৃঙ্খলা আনতে এবার ডিলারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে সংস্থাটি। তবে এবার টিসিবির লাইন ছোট হলেও পণ্য পেতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। একই সঙ্গে পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো ও তালিকায় চাল অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার সকালে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিসের সামনে পণ্য বিক্রি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি জানান, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কম দামে পণ্য দিতে পরিবার কার্ড চালু করেছে সরকার। এর মাধ্যমে ৩ হাজারের বেশি পরিবেশকের মাধ্যমে সারা দেশে ১ কোটি পরিবারের কাছে টিসিবির পণ্য সরবরাহ করা হবে।

তবে অনেকেরই অভিযোগ, যে পরিমাণ পণ্য দিচ্ছে তা দিয়ে ছোট পরিবারের এক সপ্তাহ চলা মুশকিল। এগুলো তো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, একটু বাড়িয়ে দিলে ভালো হতো। কমপক্ষে যেন এক মাস চলা যায়, সেই পরিমাণ পণ্য দেওয়া হলে আমাদের জন্য উপকার হতো।

এ বিষয়ে টিপু মুনশি বলেন, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট দূর করার জন্য সাশ্রয়ীমূল্যে এসব পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এতে হয়তো পুরো মাসে একটা ফ্যামিলির চলতে কষ্ট হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীও সাশ্রয়ী হতে বলেছেন। আমার মনে হয় সাশ্রয়ী হলে এই পণ্য দিয়েই চলা সম্ভব হবে।
টিসিবি জানায়, আগস্ট মাসের জন্য প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ জন ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩১ জন পরিবেশক বা ডিলার পণ্য বিক্রির এ অনুমতি পেয়েছেন। সোমবার টিসিবির কাছে টাকা জমা দিয়ে পণ্য বুঝে নেন তারা। পরে রাতেই প্যাকেটজাত করে মঙ্গলবার সকাল থেকে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি শুরু করেন।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা মোতাবেক ফ্যামিলি কার্ডধারী দেশের ১ কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে চিনি প্রতি কেজি ৫৫ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৬৫ টাকা, সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১১০ টাকা এবং পেঁয়াজ প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে (ভর্তুকি মূল্যে) টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতি কার্ডধারীর কাছে এক কেজি চিনি, দুই কেজি মসুর ডাল, দুই লিটার সয়াবিন তেল এবং দুই কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে।

সিটি করপোরেশন ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে এসব পণ্য বিক্রি অব্যাহত থাকবে। তবে পেঁয়াজ শুধু মহানগরী ও টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয়-সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে বিক্রি করা হবে।
গতকাল মঙ্গলবার মিরপুর ১ নম্বর আহমেদনগরে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ডিলার পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, ভোক্তার লাইন খুব একটা বড় না হলেও পণ্য পেতে দেরি হচ্ছে তাদের। মঝেমধ্যেই লাইনে ঢুকে যাচ্ছে বাইরের লোক। এ নিয়ে হট্টগোলও হচ্ছে। তবে সবাই পণ্য পাবেন এই আশ্বাসে সবার মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। তবে অনেকেই আবার দুই/তিনটা কার্ড আনছেন। বড় ফ্যামিলি, ভাইয়েরটা বা প্রতিবেশীরটা আনছেন।
তবে তেল, চিনি, ডাল নিয়ে অভিযোগ না থাকলেও অভিযোগ রয়েছে পেঁয়াজ নিয়ে। পারুল নামে এক নারী বলেন, টাকা দিয়ে বাধ্য হয়ে এই পচা পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে। ইচ্ছে করছে এই পচা পেঁয়াজ প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে ফেলে আসি।
এদিকে পণ্য দিতে দেরি হওয়া আহমেদনগরের বিপণন কর্মকর্তা শাহিন বলেন, কার্ড নিয়ে স্ক্যান করে কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে পণ্য দেওয়া হচ্ছে। এসব করতেই দেরি হচ্ছে। আমরা ১ হাজার লোককে পণ্য দেব। যতক্ষণ পণ্য থাকবে ততক্ষণই দেব। এই ওয়ার্ডের আওতায় ৭ হাজার ৪৮৫ জন কার্ডধারী আছেন। তবে যাদের কার্ড আছে কেউই বাদ যাবে না, সবাই পাবে। এই মাল ফুরালে আবারও আনা হবে।
পেঁয়াজের মান খারাপের বিষয়ে তিনি বলেন, পেঁয়াজ খারাপ না। আপনি একটা পেঁয়াজও পচা পাবেন না। আসলে পেঁয়াজ চাপা থাকলে একটু গন্ধ বের হবেই।

মিরপুর তাজলেনের আরেকটি টিসিবির বিপণন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় বিশাল লাইন। বিতরণ কাজে চার-পাঁচজন কাজ করলেও পণ্য পেতে লাগছে সময়।

বিপণন কেন্দ্রটির কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বিশ্বাস বলেন, প্রথম দিন তাই চাপ বেশি। অনেকেই ভাবছেন পরে গেলে আর পণ্য পাবেন না। তবে সবাইকেই দেওয়া হবে, যাদের কার্ড আছে। এই ওয়ার্ডে ৮ হাজার ৬৯৫ জন কার্ডধারী রয়েছেন।

রাজশাহীতেও পচা পেঁয়াজ, ক্রেতাদের ক্ষোভ : রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী নগরীর ১০টি ওয়ার্ডে টিসিবির পণ্য বিতরণ শুরু করেছেন ডিলাররা। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, টিসিবির ডিলাররা জোর করে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে পচা পেঁয়াজ কিনতে বাধ্য করছেন। এতে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকেই। মঙ্গলবার নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট, রেলগেট, লক্ষ্মীপুর ও কোর্ট এলাকাসহ বেশ কয়েকটি পয়েন্টেই টিসিবির ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে জোরপূর্বক পচা পেঁয়াজ বিক্রির অভিযোগ মিলেছে।
নগরীর বেলদারপাড়া এলাকার মুন্না নামে ভোক্তা জানান, টাকা দিয়ে পচা বা নষ্ট খাবার কিনে আমাদের কোনো লাভ নেই, বরং ক্ষতিই। তারপরও ডিলাররা আমাদের বাধ্য করছেন অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে পচা পেঁয়াজ নিতে।
এ ব্যাপারে টিসিবি রাজশাহীর অফিস প্রধান শাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অন্যান্য সময়ের মতো এবারও রাজশাহী মহানগর ও জেলা মিলে প্রায় সোয়া ২ লাখ পরিবার এই সুবিধা পাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এসব পণ্য রাজশাহী মহানগরের ৩০টি ওয়ার্ড এবং জেলার ৯টি উপজেলা এলাকায় বিতরণ করা হবে। শুধু মহানগরেই পেঁয়াজ সংযোজন করা হয়েছে। উপজেলাগুলোতে পেঁয়াজ দেওয়া হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে টিসিবির নিত্যপণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার সকাল থেকে। এবার ট্রাকসেল নয়, ডিলারের মাধ্যমে ওয়ার্ডভিত্তিক কার্ডধারীদের মধ্যে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান টিসিবির কর্মকর্তারা। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন টিসিবি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, সকাল থেকে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নিত্যপণ্য সামগ্রী বিক্রি শুরু হয়। এই কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে চট্টগ্রামে ৫ লাখ ৩৫ হাজার পরিবার টিসিবির নিত্যপণ্য সামগ্রী পাবে।
নগরীর চান্দগাঁও ওয়ার্ডের ফরিদের পাড়া এলাকার বাসিন্দা রাইসা মাহমুদা বলেন, সরকার যেন এই পণ্য বিক্রিীঅব্যাহত রাখে। এতে আমাদের মতো গরিব মানুষ অন্তত না খেয়ে মরবে না।
সূত্র আরও জানায়, বৃহত্তর চট্টগ্রামে (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) ২০২ জন ডিলারের মাধ্যমে সাড়ে ৮ লাখেরও বেশি পরিবারের মধ্যে ন্যায্যমূল্যের এসব পণ্য আগের নির্ধারিত মূল্যেই বিক্রি করা হচ্ছে।
সিলেট ব্যুরো জানায়, টিসিবি সিলেট আঞ্চলিক কর্মকর্তা মো. ইসমাইল মজুমদার জানান, বিভাগজুড়ে আমাদের ২১৭ জন ডিলার আছেন। মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পণ্য বিক্রি শুরু হলেও সোমবার থেকে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে আমাদের ডিলাররা পণ্য বিক্রি শুরু করেছেন। ডিলাররা নির্দিষ্ট দোকানে পণ্য বিক্রি করবেন। তিনি বলেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় প্রক্রিয়াগত কিছু জটিলতায় পণ্য বিক্রি শুরু হয়নি। শিগগিরই বিক্রি শুরু হবে।
মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here