ডিএনএ নমুনা দিয়ে নদীর তীরে স্বজনদের খোঁজ

0
97

(দিনাজপুর২৪.কম) বরগুনার খাজুরা গ্রামের হেলাল (৪০) তাঁর মা তহমিনা বেগম (৫৫) গতকাল সকাল থেকেই জেনারেল হাসপাতালে এসে অপেক্ষায়। দুজনের হাতে তিনজনের ছবি। কে নিখোঁজ—প্রশ্ন করতেই ঢুকরে কেঁদে ওঠেন তাঁরা। হেলাল বলেন, তাঁর ছোট ভাই মহিন (৩৪), ভাতিজা মুতাচ্ছিম (১০) ও ভাগ্নি হনুফা আক্তার রিমু (২১) তিনজনই অভিযান-১০ লঞ্চের অগ্নিকাণ্ডে হারিয়ে গেছেন। ‘অনেক খুঁজে তাঁদের পাই নাই। পুইড়া কয়লা হইহ্যা গেলেও যদি জানতাম তবুও মনে সান্ত্বনাডা পাইতাম। তাই আমরা রক্ত দেতে আইছি।’

হেলাল জানান, যাচাই করে তাঁর ভাইয়ের জন্য বাবা আব্দুল হকের রক্তের নমুনা নেওয়া হয়েছে। ভাজিতা মুতাচ্ছিমকে শনাক্তে রক্ত দিয়েছে ছোট ভাই সেন্টু। আর ভাগ্নি রিমুর জন্য রক্ত দিয়েছেন ভগ্নিপতি হারুনুর রশিদ।

গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত এভাবেই ২৩ নিখোঁজের ২৭ জন স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক শাখার সদস্যরা এ নমুনা সংগ্রহ করেন। একইভাবে ঝালকাঠিতে চারজন নিখোঁজের শনাক্তে নমুনা দিয়েছেন দুই সহোদর। এই হিসাবে গতকাল ২৭ নিখোঁজের ২৯ স্বজন ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা দিয়েছেন।

মৃত হলেও নিখোঁজদের খোঁজ পাওয়ার আশায় গতকাল সকাল থেকেই দুই জায়গায় ভিড় করেন স্বজনরা। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ডিএনএ নমুনা দিতে যান। কেউ খোঁজ নিতে থাকেন সন্ধ্যা নদীর পারে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাই শেষে মা-বাবা, সন্তান ও ভাই-বোনদের কাছ থেকে নমুনা রাখা হয়। সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষাগারে যাচাই করতে অন্তত এক মাস সময় লাগবে। এরপর কবরে দেওয়া নম্বরে শনাক্ত হবে পরিচয়।

এদিকে গতকাল পর্যন্ত বরগুনা জেলা প্রশাসন নিখোঁজ হিসেবে ৩৩ জনের তালিকা করেছে। ঝালকাঠি পুলিশ করেছে নিখোঁজ ৪০ জনের তালিকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, যাচাই করে তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।

বরগুনার তালতলী এলাকার রাহিমা (৪২) হাতে ছবি নিয়ে দিনভর বসে ছিলেন বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। শেষে রক্ত দিয়ে কেঁদে ফিরেছেন। তাঁর বোন রেখা (৩৮) নিখোঁজ। জানতে চাইলে কেঁদে বলেন, রেখা ঢাকায় গার্মেন্টে কাজ করত। বৃহস্পতিবার নাতি জুনায়েদকে (৫) নিয়ে বাড়ি আসছিল। লঞ্চের আগুনে তারা দুজনই নিখোঁজ হয়েছে। রাহিমা বলেন, ‘বোনডার কবরও যদি পাই, মনের সান্ত্বনা পামু। এই আশায় এহানে আইছি।’ জুনায়েদের বাবা জাহাঙ্গীরও এসেছিলেন রক্তের নমুনা দিতে।

বরগুনার দক্ষিণ বড় লবণগোলা গ্রামের হাকিম শরীফকে (৪৫) খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজনরা। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী পাখি (৩২) ও দেড় বছরের শিশু সন্তান নসরুল্লাহও নিখোঁজ। তাঁদের খুঁজে ফিরছে হাকিম শরীফের বড় তিন মেয়ে। তাঁদের মধ্যে হাফিজা (১৮) গতকাল বরগুনা হাসপাতালে নমুনা দেন। তিনি কেঁদে বলেন, ‘রাত সাড়ে ৮টায় বাবা ফোন দিয়ে কইছিল আমাগো লইগ্যা নতুন কাপড়-চোপড় নিয়াবনে। এরপর সকালে ফোন দেলে দেখি ফোন বন্ধ। এরপর হুনি লঞ্চে আগুন। এরপর আর তাগো পাই না।’ হাফিজা জানান, ঝালকাঠিতে তাঁদের কিছু আত্মীয়-স্বজন গতকালও খুঁজতে গেছে।

হাসপাতালে এসে বাবার ছবি হাতে অপেক্ষা করছিল ছয় বছরের সাদিয়া। সঙ্গে ছিল তার মা রোকেয়া আক্তার প্রিয়া। ছোট্ট সাদিয়া বলে, ‘আমার আব্বুরে পাই না। আব্বু আইতাছে বলছে। আব্বুরে খুঁজতে আসছি।’ সাদিয়ার মা রোকেয়া আক্তার কেঁদে বলেন, তাঁর স্বামীর নাম আব্দুল হক। তাঁর শ্বশুরবাড়ি নরসিংদীর রায়পুরায়। বরগুনার আমতলায় তাঁর বাবার বাড়ি। কিছুদিন আগে সাদিয়াকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন রোকেয়া। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর স্বামী আব্দুল হক লঞ্চে শ্বশুরবাড়িতে আসছিলেন। এরপর তাঁর আর হদিস পাওয়া যায়নি। গতকাল শিশু সাদিয়ার রক্ত নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছে।

বামনার গোলাঘাটা গ্রামের হেলাল (৩২) জানান, তাঁর বাবা আব্দুল হামিদ হাওলাদারকে (৬৮) খুঁজে পাচ্ছেন না। মা, বোন ও বাবা ওই লঞ্চে ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। আগুন থেকে মা ও বোন বেঁচে ফিরলেও বাবার খোঁজ মেলেনি। সবখানে খুঁজে ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছেন তিনি।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে মা আর বোনের সন্ধান পাওয়ার আশায় বরগুনায় এসেছেন রিসান শিকদার রনি (২০)। আগুনে তাঁর দুই পা পুড়ে গেছে। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের দেউলি গ্রামে। বরগুনার বেতাগীতে নানাবাড়ি। বৃহস্পতিবার মা রিনা বেগম (৪০) ও ছোট বোন লিমা আক্তারকে (১৪) নিয়ে ঢাকা থেকে নানাবাড়িতে যাচ্ছিলেন রনি। গতকাল নমুনা দিতে এসে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে দুজনের ছবি আঁকড়ে কাঁদতে থাকেন তিনি। রনি বলেন, ‘আমার পায়ের পোড়া কিছুই না। মনটা কেমন করতাছে কইতে পারমু না। তাগো যদি একটু খোঁজ পাইতাম। একটু জানার জন্য আইসা পড়ছি এইখানে।’

আলামত সংগ্রহ শেষে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের পরীক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এক মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করব। নমুনা নেওয়ার ক্ষেত্রে সন্তান ও মা-বাবাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। ছেলেকে আমরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। আরো যদি কোনো স্বজন আসে তাহলে কাল (আজ) নমুনা নিয়ে আমরা ঢাকায় ফিরব।’

বরগুনা জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, নিখোঁজদের তালিকা হালনাগাদ করে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। দাবিদার স্বজনদের তথ্য যাচাই করে নমুনা সংগ্রহ শেষে বলা যাবে কতজন নিখোঁজ রয়েছেন।

গতকাল বিকেলে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতীরে মিনি পার্কে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের নমুনা সংগ্রহ শুরু করেছে সিআইডির আরেকটি দল। সন্ধ্যা পর্যন্ত মনির হোসেন ও জনি নামের দুই ভাই রক্তের নমুনা দিয়েছেন। ঢাকার ডেমরার তাসলিমা আক্তার (৩২), সুমাইয়া আক্তার (১৫), সুমনা আক্তার তানিসা (১৩) ও জুনায়েদ ইসলামকে (৭) খুঁজতে আসেন তাঁরা। জুনায়েদ জনির ছেলে। তাসলিমা বোন ও অপর দুজন ভাগ্নি। বরগুনায় তাসলিমার শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিল তারা।

ঝালকাঠি সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার অরিত সরকার বলেন, নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হবে। আগামীকাল (আজ) কোনো স্বজন এলে তারও নমুনা নেওয়া হবে।’

বিষখালী নদীতে উদ্ধার হওয়া লাশের দাবিদার দুই পক্ষ

গতকাল সন্ধ্যায় চতুর্থ দিনে উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় বিষখালী নদী থেকে যুবক বয়সের একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। গত রাতে ওই যুবককে নিজেদের স্বজন বলে দাবি করেছে দুই পক্ষ। এক পক্ষের দাবি, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির নাম মো. শাকিল মোল্লা। তিনি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইর গ্রামের মৃত শফি উদ্দিন মোল্লার ছেলে। আগুন লাগা লঞ্চের সহকারী বাবুর্চি ছিলেন তিনি। ফেসবুকে ছবি দেখে বোন সাহিদা আক্তার নিশা ভাইয়ের মৃতদেহ শনাক্ত করেন।

আরেক পক্ষ বলছে, ওই ব্যক্তি বরগুনা সদরের বড় লবণগোলা গ্রামের হাকিম শরীফ। তিনি ঢাকার একটি কম্পানিতে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি করেন। হাতের আংটি ও পোশাক দেখে হাকিম শরীফের বড় ভাই আবদুল মোতালেব শরীফের মৃতদেহ শনাক্ত করেন।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার শফিকুল ইসলাম বলেন, যেহেতু দুই পক্ষ উদ্ধার হওয়া যুবককে তাদের স্বজন দাবি করছে, তাই উভয় পক্ষের লোকজন আসার পরে লাশ দেখানো হবে। উপযুক্ত প্রমাণের পরে প্রশাসনের মাধ্যমে লাশ হস্তান্তর করা হবে। অন্যথায় ডিএনএ পরীক্ষার পর লাশ হস্তান্তর করা হবে।

এই মৃতদেহটি লঞ্চঘাট এলাকায় নিয়ে আসার পর ছুটে আসেন বরগুনার পাথারঘাটার শাহিনুর বেগম। তিনি বাবা মুজাফ্ফর, মা আমেনা বেগম, দুই মেয়ে কুলসুম বেগম, আয়শা ও ছেলে ওবায়েদুল কাদেরকে হারিয়েছেন। পরিবারের সবাইকে হারানো শাহিনুর মৃতদেহটি দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিজের ছেলে ভেবে ছুঁয়ে দেখেন। শাহিনুর বলেন, ‘আমার মা-বাবা সৌদি আরব থেকে এসে বলেন, তোর ছেলেমেয়েদের (নাতি-নাতনি) পাঠিয়ে দে। একসঙ্গে ঢাকা থেকে আসব। মা-বাবার সঙ্গে আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলেও লঞ্চে আসছিল। লঞ্চে আগুনের খবর পেয়ে আমি রবিবার ঝালকাঠি এসেছি।-অনলাইন ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here