দশ দফা ঘোষণা দেবে বিএনপি : গোলাপবাগ মাঠে বিভাগীয় গণসমাবেশ আজ

0
36

(দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম) ঢাকায় বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশের স্থান শেষমেশ চূড়ান্ত হয়েছে। আজ শনিবার রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে বেলা ১১টায় গণসমাবেশ শুরু হবে। গণসমাবেশ থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ এবং ১৯৯৬ সালের আলোকে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করাসহ ১০ দফা ঘোষণা করবে দলটি। আগামী ২৪ ডিসেম্বর যুগপৎ আন্দোলন শুরু করার ঘোষণাও আসবে।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস গ্রেপ্তারের পর গণসমাবেশের স্থান ও করণীয় ঠিক করতে গতকাল সকালে ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেন দলের স্থায়ী কমিটি। ওই বৈঠকে ১০ দফা দাবি ও যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়।

গণসমাবেশ আয়োজনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মির্জা আব্বাস। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ায় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় এ দায়িত্ব পালন করবেন। গোলাপবাগের সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি গ্রেপ্তার হলে ক্রমানুসারে স্থায়ী কমিটির পরবর্তী জ্যেষ্ঠ সদস্য প্রধান অতিথি হবেন। এই সমাবেশ পরিচালনার কথা রয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব আমিনুল হক ও দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল আলম মজনুর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দিক থেকে অনুমতি পাওয়ার পরপরই সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘শনিবার (আজ) বেলা ১১টায় সমাবেশ শুরু হবে। গোলাপবাগ মাঠে মঞ্চ তৈরি, মাইক লাগানো এবং নিরাপত্তার জন্য আমরা পুলিশের সহযোগিতা চাই।’

এদিকে সমাবেশের অনুমতি পাওয়ার আধাঘণ্টার মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীরা গোলাপবাগ মাঠে জড়ো হতে থাকেন। রাতে দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা মাঠ পরিদর্শন করেন।

ঢাকার গণসমাবেশ ঘিরে কিছুদিন ধরেই রাজনীতিতে উত্তেজনা চলছে। সহিংসতার শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতা জারি করেছে।

প্রায় তিন মাস আগে ১০ বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বিএনপি। ঢাকায় ১০ ডিসেম্বর গণসমাবেশ করতে নয়াপল্টনের জন্য অনুমতি চেয়ে গত ১৩ নভেম্বর ও ২০ নভেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন কমিশনার (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে লিখিত আবেদন করে বিএনপি। কিন্তু বিএনপিকে ২৬ শর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণসমাবেশের অনুমতি দেয় পুলিশ। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে টানাপোড়েন চলে।

গতকালের আগ পর্যন্ত নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ব্যাপারে অনড় ছিল বিএনপি। এর মধ্যে গত বুধবার পল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এতে একজনের মৃত্যুও হয়। এ অবস্থায় গণসমাবেশের স্থান নিয়ে ডিএমপি ও বিএনপির মধ্যে কথা চালাচালি এবং বৈঠক চলতে থাকে। নয়াপল্টন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়াও টঙ্গী এজতেমা মাঠ ও পূর্বাচল বাণিজ্যমেলার মাঠও আলোচনায় আসে।

সর্বশেষ পুলিশের পক্ষ থেকে মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ এবং বিএনপির পক্ষ থেকে কমলাপুর স্টেডিয়াম প্রস্তাবে আসে। এরপর উভয় পক্ষ দুটি স্থানই পরিদর্শন করে। কিন্তু উভয় মাঠকে ‘অনিরাপদ’ দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে গণসমাবেশ করার প্রস্তাব দেন। সেখানেই গতকাল শুক্রবার ২৬ শর্তে অনুমতি দেয় ডিএমপি।

গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে বিভাগীয় গণসমাবেশ শুরু করে বিএনপি। পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, সিলেট, কুমিল্লা, রাজশাহী বিভাগে সমাবেশ করে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ছাড়া সব সমাবেশের আগে গণপরিবহন ধর্মঘট ডাকা হয়।

নির্দলীয় সরকারের দাবি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং দলীয় নেতাকর্মী হতাহতের প্রতিবাদে সব বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশের কর্মসূচি দেয় বিএনপি। আজ ঢাকার গণসমাবেশের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি শেষ হবে।

গণসমাবেশের অনুমতি পাওয়ার পর গতকাল বিকালে গুলশানে মিত্র দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম। সেখানে বিএনপির ১০ দফার প্রতি সমর্থন চান তিনি। সেখানে তাদের জানানো হয়, সমাবেশে বিএনপি ১০ দফার ভিত্তিতে আগামী ২৪ ডিসেম্বর গণমিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করবে। সে অনুযায়ী মিত্র দলগুলোও কর্মসূচি ঘোষণা করবে। তবে অবস্থার ভিত্তিতে কর্মসূচিতে পরিবর্তনও আসতে পারে। সমাবেশে বিএনপি অভিন্ন দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করবে। বিএনপির মিত্র দলগুলোও যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে একই কর্মসূচি ঘোষণা করবে।

এরপর সংবাদ সম্মেলন করে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ১০ ডিসেম্বর এই সরকারকে বিদায়ের জন্য ১০ দফা দাবি ঘোষণা করব। এর ভিত্তিতে যুগপৎ আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। জানা গেছে, বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আগামী ২৪ ডিসেম্বর যুগপৎ আন্দোলন শুরু হবে। বিএনপির মিত্র দলগুলোও যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে একই কর্মসূচি ঘোষণা করবে।

১০ দফা

১. বর্তমান অনির্বাচিত অবৈধ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে ভোটবিহীন, গণতন্ত্রহরণকারী, লুটেরা ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে; ২. ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ-এর আলোকে দলনিরপেক্ষ একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে; ৩. নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বর্তমান অবৈধ নির্বাচন কমিশন বাতিল করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। এই কমিশন অবাধ নির্বাচনের অনিবার্য পূর্বশর্ত হিসেবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরপিও সংশোধন, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল ও পেপার ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল করতে হবে; ৪. দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ সব বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী, পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী সব মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক এবং আলেমদের সাজা বাতিল, সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সব রাজনৈতিক কারাবন্দিকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। দেশে সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশে কোনো বাধা সৃষ্টি না করা; সব দলকে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে প্রশাসন ও সরকারি দল কর্তৃক কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টি না করা; স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নতুন কোনো মামলা ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা যাবে না; ৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, সন্ত্রাস দমন আইন-২০০৯ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সব কালাকানুন বাতিল করতে হবে;

৬. বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, সার ও পানিসহ জনসেবা খাতে মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। ৭. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে এবং নিত্যপণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, শিশুশ্রম বন্ধ করা ও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে; ৮. গত ১৫ বছর ধরে বিদেশে অর্থপাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ারবাজারসহ রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করার লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করতে হবে; ৯. গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার করতে হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার আইনানুগ বিচারের ব্যবস্থা করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর ও সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়ায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; ১০. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের উপযোগী করার লক্ষ্যে সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহার করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

-সূত্র : আমাদের সময়

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here