দিনাজপুরের ৪ উপজেলায় ইউএনও নারী : কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন দূরন্ত গতিতে

0
79

স্টাফ রিপোর্টার (দিনাজপুর২৪.কম)  দিনাজপুর জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে চার উপজেলায়-ই দায়িত্ব পালন করছেন চার নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। নিজ নিজ উপজেলায় তারা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত দিনগুলোতে এক সাথে ৪ নারী ইউএনও পায়নি দিনাজপুরবাসী। তারা কাজও করছেন দূরন্ত গতিতে। নারী ইউএনওদের পেয়ে খুশি দিনাজপুরবাসী।

ছন্দা পাল
২০২০ সালের ৫ জুলাই দিনাজপুরের বোঁচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন ছন্দা পাল। জন্ম তার খুলনা শহরে। তিনি খুলনা করনেশন স্কুল থেকে এসএসসি, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স ও মাস্টর্স করেন।

৩১তম বিসিএসে তিনি গণপূর্ত ক্যাডারে চাকরিতে প্রবেশ করেন। এর পর ৩৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে তিনি রংপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন।

পরবর্তী সময় তিনি রংপুর সদর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর পর কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সবশেষ ২০২০ সালের ৫ জুলাই তিনি দিনাজপুরের বোঁচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।

নারী হিসেবে ইউএনও পদে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বলেন, কোনো কাজেই তিনি কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হননি। এখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি স্থানীয় সাংসদ নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ উপজেলার সব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা পেয়েছেন এবং পাচ্ছেন। এ জন্য তিনি প্রশাসনিক এ দায়িত্ব পালনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।

একজন নারী ইচ্ছা করলেই সব কাজ ভালোভাবে করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় নারী-পুরুষের বিভেদ থাকলেও এখন আর তা নেই। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি সমাজে মেয়েদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

আয়েশা সিদ্দীকা
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আয়েশা সিদ্দীকা। জন্ম শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায় হলেও বড় হয়েছেন ঢাকাতেই।

ময়মনসিংহ ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাশ করার পর আয়েশা সিদ্দীকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এর পর ডেইলি সান ও ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন তিনি। পরে ৩১তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ২০১৩ সালে কুমিল্লা কালেক্টরেটে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন তিনি। এর পর ঢাকার মিরপুর সার্কেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আয়েশা সিদ্দীকা।

সবশেষ ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে আয়েশা সিদ্দীকা বলেন, নারী হিসেবে প্রশাসনিক এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়নি।

তিনি বলেন, প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই। কারণ একজন পুরুষ প্রশাসনের যেসব কাজ করতে পারে, নারীরাও তার চেয়ে কোনো অংশেই কম করতে পারে না। নারী হিসেবেও তিনি রাত-দিন কাজ করে থাকেন। ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে তার সহজ হয়েছে। সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনা নিয়ে কাজ করলে প্রতিটি কাজই ভালোভাবে করা যায়। এ চিন্তা চেতনা নিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

রাশিদা আক্তার
দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে কর্মরত রয়েছেন রাশিদা আক্তার। বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলায়।

রাশিদা আক্তার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার ব্রাক্ষ্মণভিটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, মুন্সীগঞ্জ জেলার সরকারি হরগঙ্গা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকার তিতুমীর কলেজ থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ২০০৫ সালে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে সারা দেশের মধ্যে সপ্তম স্থান অধিকার করেন তিনি। এর পর তিনি বিএড এবং এমএড ডিগ্রিও অর্জন করেন।

৩১তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ন হয়ে প্রথমে রাজশাহী কালেক্টরেটে যোগদান করেন রাশিদা বেগম। চার বছর সেখানে কর্মরত থাকার পর মানিকগঞ্জে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদান করেন। পরে ঢাকায় বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর পর গত ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন রাশিদা বেগম।

একটি উপজেলার নির্বাহী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতায় রাশিদা আক্তার বলেন, সমাজে নারীরা আর পিছিয়ে নেই। একজন পুরুষ যেভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন, তার থেকে কোনো অংশেই তারা কম দায়িত্ব পালন করেন না।

তিনি বলেন, নারী হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কখনই কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হননি; বরং সবার সহযোগিতাই পেয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিটি কাজ সময়মতো করতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এই নারী কর্মকর্তা।

মোছা. আফছানা কাওছার
মোছা. আফছানা কাওছার। চলতি মার্চ মাসের ৬ তারিখে দিনাজপুরের বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেছেন তিনি। এর আগে ওই উপজেলায় পর পর দুবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন আফছানা কাওছার। বিরলে টানা তৃতীয়বারের মতো নারী ইউএনও হিসেবে যোগদান করেন তিনি।

মোছা. আফছানা কাওছারের বাড়ি নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায়। ডিমলা থেকে তিনি এএসসি পাশ করেন। এর পর রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করেন তিনি।

৩৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি প্রথমে সাতক্ষীরা ও পরে গাজীপুর কালেক্টরেটে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আফছানা কাওছার। এর পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে কর্মরত ছিলেন। এর পর ৬ মার্চ বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন মোছা. আফছানা কাওছার।

তিনি বলেন, একজন নারী হিসেবে প্রশাসনিক এই দায়িত্ব পালন করা একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ একজন নারীকে সোসাইটি ও ফ্যামিলি মেইনটেইন করেই প্রশাসনিক এই দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই হিসেবে একজন পুরুষের চেয়ে নারীকে অনেক বেশি দায়িত্ব পালন ও পরিশ্রম করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পরিবারের অনেক সাপোর্ট দরকার। যেটি তিনি পাচ্ছেন বলেই ভালোভাবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন।

তিনি আরও বলেন, অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও এখন নারীদের জন্যও প্রশাসনিক এই দায়িত্ব পালন করা অনেকটাই সহজ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নারীরা ভালো করছেন। প্রশাসনিক এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারীর ক্ষমতায়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

নারীরা আজ বহুদূর এগিয়েছে। এ সবই উঠে এসেছে দিনাজপুরে আন্তর্জাতিক নারি দিবস পালনে। নারীরাও সরকারি বিভিন্ন স্তরে সরকার পরিচালনা করছে।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here