দিনাজপুরে জীবনযুদ্ধে ঈদ উধাও ‘দুধ আছে চিনি নাই, চিনি থাকলে সেমাই নাই’

0
61
ছবি-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) দিনাজপুরের চিরিরবন্দর। উপজেলা শহর থেকে উত্তর কোণে ১২ কিলোমিটার গেলে মিলবে পশ্চিম সাইতারা গ্রামের দেখা। গ্রামে পা রেখেই মনে হবে ছোট কোনো দ্বীপ। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-যেদিকে যায় চোখ; কাঁকড়া নদীর স্রোত। গ্রামে যেতে পড়ে সরু কালভার্ট। সাইকেল, মোটরসাইকেল আর রিকশা-ভ্যান ছাড়া অন্য কোনো বাহন গ্রামে ঢোকার নেই উপায়। ভঙ্গুর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নদীর বাঁধই যেন গ্রামবাসীর ‘হাতের লাঠি’। বাঁধের পথ ধরেই তাদের নিত্য চলাচল।

সদাই কিনতে চাইলে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয় বুড়িরহাটে। বর্ষায় গ্রামের মানুষ পড়ে আরও দুর্বিপাকে। তখন নৌকা হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। বাঁশের সাঁকো কিংবা নৌকা যে মাধ্যমেই বুড়িরহাটে যাওয়া হোক না কেন, ঘাটের ইজারাদারের হাতে প্রতিবার পাঁচ টাকা করে গুঁজে দিতে হয় মাথা গুণে। যাচ্ছেতাই যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ওই গ্রামে উৎপাদিত ধান কিংবা শাকসবজি, সবকিছুরই ‘পানির দর’। ফলে কয়েক কিলোমিটারের ভেতর জিনিসপত্রের দামের ফারাক যোজন-যোজন।

বছরের অন্য সময়ে গ্রামের মানুষ থাকে বিষাদে। ঈদ ঘিরে এ সময়টাতে হতদরিদ্র মানুষের হাতে ওঠে ১০ কেজি করে ভিজিএফের চাল। তাও বঞ্চিত হয় কেউ কেউ। ঈদ মানে যে নতুন বসন, আনন্দের ফলগুধারা কিংবা ভালো খাওয়া- এসব উৎসবের রং তাদের মন ছুঁয়ে যায় না। সকালে ঈদের নামাজ পড়ার ভেতরেই যেন বন্দি তাদের আনন্দের ঘুড়ি।

গেল দুই বছর করোনার ছোবলে এমনিতেই ছিল নিরানন্দ ঈদ। এবার ঈদ খুব কাছে চলে এলেও ওই গ্রামের মানুষের মনে নেই উৎসাহ-উদ্দীপনা, প্রস্তুতি নেই ছিটেফোঁটাও।

শুক্রবার বিকেলে চিরিরবন্দরের পশ্চিম সাইতারা গ্রামের উত্তর মোল্লাপাড়ার বাড়ির আঙিনায় মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, অন্যের বাড়িতে দিন হাজিরা কাজ করে চলে তার সংসারের চাকা। মাঝেমধ্যে অন্যের জমি বর্গা নিয়ে করেন চাষবাস। তিনি বলেন, ‘দুধ আছে তো চিনি নাই, চিনি আছে তো আমাদের সেমাই নাই। কীভাবে আমাদের ঈদ কাটবে।’

মোল্লাপাড়া এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ পরিবারের বাস। সবারই মাটির ঘর। হঠাৎ উঁকি দেয় দু-একটি ইটের দালান, তাও ভঙ্গুর-স্যাঁতস্যাঁতে। পরিবারের কর্তা কেউ কৃষিজীবী, কেউ দিনমজুর। কয়েকজন আছেন যারা রিকশা-ভ্যান কিংবা ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালান। আর প্রায় সবাই ঘরে পোষেন গরু-ছাগল।

ঈদ দরজায় কড়া নাড়লেও মোল্লাপাড়ার কোনো পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরা নতুন কাপড়। রোজার ঈদের প্রধান আকর্ষণ সেমাই, সেটাও কোনো পরিবারে কেনা হয়নি এখনো। পরিবারে ছোট শিশুটিও ঈদের এক টুকরো নতুন কাপড়ের জন্য গরিব বাবার চোখে রাখছে চোখ।

মজিবর রহমান। বয়স পেরিয়েছে আশির চৌকাঠ। তিনি বলেন, ‘দিনে আনি, দিনে খাই। ঈদ করার মতো সামর্থ্য-শক্তি নাই। টাকা নাই, পাইসা নাই। কেমন করি কাপড়-চোপড় নিমো। শান্তি মতো ঈদ করিতে পারি না।’

৯০ বছর ছুঁইছুঁই নিজাম উদ্দিনের তিন ছেলে। অভাবের কারণে ছেলেদের পড়াশোনা করাতে পারেননি। এখন ছেলেরা নিজের কিছু জমি আর অন্যের কিছু জমি বর্গা নিয়ে কৃষিকাজ করেন। নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘গতবার মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করিছি, করোনার ভয় ছিল। এইবার মনে হয় মাঠে ঈদের নামাজ হবে। কাপড়-চোপড় কিনি নাই, কিনতে পারুম কিনা হবে আল্লাই জানে। না হইলে পুরনা কাপড়া দিয়াই ঈদ হবে।’

ঈদে কাপড় কিনতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নে নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী মহসেনা বেগম বলেন, ‘মিথ্যা কথা কহিয়া লাভ নাই। যখন পয়সা হয় তখন করি, ঈদের সময় করি না। ঈদের দিন সেমাই রান্দি, গোশত পাক করি কোনো দিন, পোলাও রান্দি, ভাত রান্দি।’

একই এলাকার মৃত সাজো মিয়ার স্ত্রী মালেকা বেগমের তিন ছেলে। নিজেদের ভিটা ছাড়া কোনো জমি নেই। মালেকা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, পয়সা না থাকিলে কেমন করি যামো কিনাকাটা করিবার।’

ফাইবা আক্তার বলেন, ‘অভাবি সংসার আর কি ঈদ করিমো। কাপড় কিনির পারি না, সেমাই-চিনি কিনির পারি না। কীভাবে দিন কাটাই? দান দেয় মানুষ, গরিব মানুষের যেমন দান দেয়। সেই রকম দান নিয়া রান্দিবাড়ি খাই। অভাবি সংসারত কাপড়- চোপড় কিনির পারি না।’

মসুদ্দিনের ছেলে আলতাব হোসেন বলেন, ‘ঈদর দিনও মাঠে কাজ করি। এইংকরি চলিছি। যারা বড়লোক, ঈদে তাদের আনন্দ সেই রকম। গরিবদের আনন্দ যার যেইংরকম সামর্থ্য।’ -ডেস্ক রিপোর্ট

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here