দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেবেন প্রধানমন্ত্রী

0
67
ছবি-সংগ্রহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়ন হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায় পুরো দেশ। প্রায় সাড়ে ৩ কোটি গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় এসেছে। এ ছাড়া নতুন নতুন গ্রাহক আবেদনের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়ে যাচ্ছেন। এক সময় বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর অফিসে ধরনা দিতে হতো। এখন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারাই গ্রাহকদের পেছনে ছোটেন বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে।

আগামী ২১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন করবেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ‘শতভাগ’ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা করবেন প্রধানমন্ত্রী।

শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়টি কী প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হলো এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, দেশের প্রতিটি গ্রামের বিদ্যুৎ সংযোগের খবর নিশ্চিত হয়ে শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, দেশের সব জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে নিজ নিজ জেলার বিদ্যুতায়নের খবর বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠাতে। জেলা প্রশাসকরা তাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়টি।

ওই কর্মকর্তা বলেন, শুধু গ্রিড সংযোগের আওতায় যারা আছেন, তাদেরই শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়নি। অফগ্রিড এলাকাতেও শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে সরকার। তবে দু-একটি অফগ্রিড এলাকায় এখনো কাজ চলছে, সেগুলোও শিগগিরই নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও দেশের শতভাগ এলাকায় বিদ্যুতায়নের বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করেছেন।

শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আমরা এক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা আসছে ২১ মার্চ। সেই সঙ্গে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে কার্যক্রম শুরু করা সর্ববৃহৎ মেগা প্রকল্প পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এই কেন্দ্রটি ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন। বর্তমান দুনিয়ার সর্বাধুনিক আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

তিনি বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী পাবে সবচেয়ে আধুনিক সুযোগসুবিধা। প্রধানমন্ত্রীর এই চিন্তা থেকেই বাস্তবে রূপ নেয় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র। শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এক সময় বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন সংসদ সদস্য বা এমপিরা ডিও নিয়ে ঘুরতেন নিজ নিজ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের জন্য। তবে এখন বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রতিটি সংসদ সদস্যকে চিঠি দেওয়া হয়েছে কারও নির্বাচনী এলাকায় বিদ্যুতায়ন বাকি আছে কিনা।

তিনি বলেন, দেশের সব এমপি নিশ্চিত করেছেন তাদের নির্বাচনী এলাকা শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

নসরুল হামিদ বলেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচগুণ বেড়েছে। ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ¦ালানি বিদ্যুৎসহ দেশে এখন ক্ষমতা ২২ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। আরও ১৩ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন অবস্থায় আছে। আগামী ২১ মার্চ শতভাগ বিদ্যুতায়নেরও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। বিদ্যুতায়ন এখন ৯৯ দশমিক ৮৫ ভাগ, একে শতভাগই বলা যায়। সারাদেশে এখন আমাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ছিল অত্যন্ত নাজুক। দিনের অধিকাংশ সময় মানুষ বিদ্যুৎহীন থাকতেন। ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করতে পারছিল না। মানুষের গড় আয় ছিল অনেক কম। ফলে সরকার দ্রুতগতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ নেয়। প্রায় এক যুগ পর সরকার এখন শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়ন করেছে। চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহ সক্ষমতা অর্জন করেছে। যদিও বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার ত্রুটি রয়ে গেছে। ফলে এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।

তবে সরকার আশা করছে, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে। ২০০৯ সালে দেশের ৪৭ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল; ২০২২ সালে সেটা শতভাগ হয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। মোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। গত ১৩ বছরে দেশে ১৪৮টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এক যুগ আগে যেখানে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো গড়ে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট; বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে উঠেছে। গড়ে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১২ হাজার মেগাওয়াট।

গ্রিড এলাকার বাইরে অফগ্রিড এলাকাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে সরকার। দুর্গম সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সাগরের তল দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে দুর্গম সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যা ওই এলাকার মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো। পদ্মার ওপারে পাবনার সুজানগরের দুর্গম চর রামকান্তপুরও বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে সরকার। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চরকুকড়ি-মুকড়ি, কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের কাটখাল ইউনিয়নের মুর্শিদপুর হাওরবেষ্টিত দুর্গম গ্রামেও বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যমুনার চরে দেশের চারটি জেলা পড়েছে- টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা। এসব জেলায় যমুনা নদীর আশপাশের দুর্গম এলাকাগুলোর চরেও বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ভোলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আওতায় অফগ্রিড এলাকার ১৬টি চরের মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে। রাজশাহীর সদর থেকে দূরে দুর্গম চরখিদিরপুরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এখনো যে অল্প কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানো যায়নি, সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে কাজ করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

এদিকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের বিষয়ে বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, আমরা দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি; এটা অনেক বড় বিষয়। সন্দ্বীপ, রাঙ্গাবালী, নিঝুম দ্বীপ, চরসোনারামপুরসহ প্রায় বেশির ভাগ চর এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পেরেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এখনো শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পারেনি। সন্দ্বীপে, রাঙ্গাবালী দ্বীপেও বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি, ওই অঞ্চলের মানুষও এক সময় বিশ্বাস করতে চাননি বিদ্যুৎ পাবেন বলে। হাতিয়া নিঝুম দ্বীপে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যমুনা, তিস্তার অনেক দুর্গম চরাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। অনেক সম্মানের।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে আগ্রাসী উদ্যোগ গ্রহণ করে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়ন না হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব নয় প্রধানমন্ত্রী সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে গত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন এখন মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়েছে। দেশের অর্থনীতি সচল হয়েছে। অগ্রগতি বেড়ে চলেছে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। আশা করছি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।

উল্লেখ্য, সরকার দেশে এক শ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে কাজ করছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত করতে মাস্টারপ্ল্যান করেছে। যার ধারাবাহিকতায় বেশকিছু বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে। আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে চলে আসবে। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ মালিকানায় খুলনার বাগেরহাটে রামপাল ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাশিয়া-বাংলাদেশের যৌথ সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ ছাড়া বেসরকারি মালিকানাধীন আর এক ডজন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। -অনলাইন ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here