নুসরাতের ৩য় মৃত্যুবার্ষিকী: আসামিদের স্বজনদের অপপ্রচারে আতঙ্কিত পরিবার

0
64

(দিনাজপুর২৪.কম) দেশে-বিদেশের আলোচিত ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুর ৩ বছর অতিবাহিত হচ্ছে রবিবার। এদিকে, দিনটিকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসামিদের স্বজনরা নুসরাতের পরিবারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

নুসরাতের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার পরিবারের পক্ষ থেকে হামিদিয়া মসজিদে মিলাত, দোয়া ও ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া, মৃত্যুবার্ষিকীর দিন রবিবার নুসরাত পরিবারের সাথে ইফতার করবেন পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রতিবারের ন্যায় দিনটিতে উত্তর চর ছান্দিয়া গ্রামে নুসরাতের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবে ফেনীর পিবিআই।

নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিষদাগার করে অপপ্রচার করছে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আত্মীয়স্বজনরা। যার কারণে আমরা সামাজিক মান সম্মানের ভয়ে আতঙ্কিত থাকি। এ ব্যাপারে আমরা আইসিটি আইনে মামলা করেছি, যা পিবিআইতে তদন্তাধীন রয়েছে।

নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, তিনটি বছর পার হলেও নুসরাতের স্মৃতি রক্ষায় তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নিজের জীবন দিয়ে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ করলেও পাননি সরকারি-বেসরকারি কোন সম্মান।

আফসোস করে তিনি বলেন, প্রতিবছর এই দিনে পুলিশ ও সাংবাদিকরা এসে খোঁজখবর নেন, তারপর আর কোন খবর থাকে না। নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পর অনেকে নানা রকম প্রতিশ্রুতি দিলেও আজও তার বাস্তবায়ন হয়নি। নুসরাতের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি সড়ক, স্কুল বা মাদ্রাসার নামকরণের দাবি জানান তিনি।

মা শিরিন আক্তারের কাছে তার প্রিয় কন্যা নুসরাত রাফির শূন্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজও প্রতিদিন ভোরে তাকে খুঁজি। মনে হয় এই বুঝি নুসরাত এসে জড়িয়ে ধরে মা বলে ডাকছে। তার স্মৃতি আজও বাড়ির সবকিছুতেই রয়েছে। তার পড়ার বই, জামা কাপড় ও পছন্দের সবকিছুই গুছিয়ে রাখা। আজ তিন বছর আমি আমার মেয়ের কণ্ঠে মা ডাকটি শুনতে পাই না। রাতে ঘুম হয় না। কারণ আমার মেয়ের হাত-পা বেঁধে যখন তারা আগুন লাগিয়েছিল, তখন আমার মেয়ে কি করেছিল, সেই চিন্তা আসে! সেদিন আমি খবর পেয়ে ফেনী সদর হাসপাতালে ছুটে যাই, তখন পুলিশ সদস্যরা আমাকে আমার মেয়ের কাছে ভিড়তে দেয় নাই। তার পুরো শরীর ব্যান্ডেজ করে ফেলে ডাক্তাররা। পুলিশরা আমাকে বলে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। বাঁচে কিনা সন্দেহ, আপনি মেয়ের আগুনে পোড়া এই শরীর দেখলে সহ্য করতে পারবেন না। ডাক্তাররা আপনাকে দূরে থাকতে বলেছে। তখন আমার মেয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল।

তিনি বলেন, দেশে করোনাভাইরাসে হাজার হাজার লোক মারা যাচ্ছে। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা মনেরে বুঝ দিতে পারবে, করোনাভাইরাসে তারা মারা যাচ্ছে। কিন্তু আমার মেয়েকে জানোয়ারেরা হাত-পা বেঁধে আগুন পুড়িয়ে মেরেছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের ৯৯ ভাগ মানুষ আমার মেয়ের পাশে ছিল। আমাদের পরিবারের পাশে ছিল। আসামি ও তাদের স্বজনরাসহ ১ পার্সেন্ট মানুষ আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে থাকতে পারে।

তিনি আরো বলেন, আমরা বিচারিক আদালতে ন্যায় বিচার পেয়েছি। শুনেছি উচ্চ আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল করেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আসামিদের রায় দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু বলেন, আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে তা অনুমোদনের জন্য উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথি) ছাপানো শেষ করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি বরাবর উপস্থাপন করা হয়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আপিল শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করেছিলেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি হাসান ইমাম ও সৌমেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এ মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে বেঞ্চ করোনার কারণে বাতিল হয়ে গেছে। এরপর বেঞ্চ গঠন হয়নি। তাই মামলাটির শুনানি হচ্ছে না।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের ছাদে নিয়ে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ৪দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১০ এপ্রিল তিনি মারা যান।

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ মামলার রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়। আসামিরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলা, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসার সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল  ও মোহাম্মদ শামীম। -অনলাইন ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here