পশ্চিম তীরে ইসরাইলি অভিযানে যেভাবে মরছে ফিলিস্তিনিরা

0
47
ইসরাইলি অভিযান শুরু হওয়ার পর নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা বাড়ছে - ছবি : সংগৃহীত

(দিনাজপুর২৪.কম) ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে চলতি বছর ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর অভিযান ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এ পর্যন্ত অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। বিবিসি এই সংখ্যাটি পেয়েছে বিভিন্ন তথ্য সংকলনের মাধ্যমে।

গত শনিবার পূর্ব জেরুসালেমে ১৮ বছরের এক তরুণকে গুলি করে হত্যার পর এই সংখ্যা এক শ’তে পৌঁছায়। এর আগের সপ্তাহে ইসরাইলি বাহিনী জেনিন শহরের একটি বাড়ি লক্ষ্য করে ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল। ওই হামলায় একজন বন্দুকধারী এবং আরও তিন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিল।

এর মানে হচ্ছে, ২০১৫ সালের পর এ বছরটি হতে যাচ্ছে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জন্য সবচেয়ে রক্তাক্ত একটি বছর।

বেশিরভাগ ফিলিস্তিনিকে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। অন্য কয়েকজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে সশস্ত্র বেসামরিক ইসরাইলিরা।

অল্প কয়েকটি ঘটনায় গুলির উৎস নিয়ে বিতর্ক আছে- এটি ইসরাইলিদের নাকি ফিলিস্তিনিদের দিক থেকে এসেছে। একজন নিহত হয়েছিল ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালিত এক অভিযানের সময়।

নিহতদের প্রায় এক পঞ্চমাংশ হচ্ছে শিশু। এ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নিহত একজনের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী যখন এক ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে অভিযান চালায়, তখন সেখানে সাত বছর বয়সী এক শিশু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। এ শিশুটির ভাইরা পাথর ছুঁড়ছিল বলে অভিযোগ তুলে ইসরাইলিরা ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এ-সপ্তাহে এই ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলছে, তারা তাদের তল্লাশি অভিযানের সাথে এই শিশুর মৃত্যুর কোন সম্পর্ক প্রাথমিক তদন্তে দেখতে পাচ্ছে না।

যারা নিহত হয়েছে তাদের মধ্যে আছে ফিলিস্তিনি চরমপন্থী সংগঠনের বন্দুকধারী থেকে শুরু করে অনেক কিশোর এবং তরুণ, যারা নাকি পাথর বা পেট্রোল বোমা ছুঁড়ছিল। আছে অনেক নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষ বা পথচারী, বিক্ষোভকারী এবং ইসরাইলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কর্মী। ইসরাইলি সেনা বা বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ছুরি বা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে কথিত হামলার সময়ও নিহত হয়েছে কয়েকজন।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, ইসরাইল এখন রাস্তাঘাটেই ফিলিস্তিনিদের ‘বিনা বিচারে হত্যা’ করছে। তবে এই একই সময়ে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক সহিংসতাও হয়েছে।

গত বসন্তে আরব ইসরাইলি এবং ফিলিস্তিনিরা বেশ কিছু মারাত্মক হামলা চালিয়েছিল, যাতে ১৬ জন ইসরাইলি এবং দুজন বিদেশী নিহত হয়। এরপর থেকে ইসরাইল প্রায় প্রতি রাতেই অধিকৃত পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান চালাতে শুরু করে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা সন্ত্রাসবাদের ক্রমবর্ধমান হুমকিকে শক্ত হাতে দমন করবেন।

যেরকম গতিতে ইসরাইল এসব সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, তা একটি ব্যাপকতর সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী প্রতিদিন রুটিন-মাফিক মাত্রাতিরিক্ত শক্তি-প্রয়োগ করছে এবং সবাইকে পাইকারি হারে সাজা দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনপুষ্ট যে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনী, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা অনেক বেড়েছে।

ইসরাইলি বাহিনীর এসব অভিযানের সময় প্রায়শই জেনিন বা নাবলুসের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তরুণ এবং নতুন করে অস্ত্রসজ্জিত চরমপন্থীদের মধ্যে বন্দুক-যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

পশ্চিম তীরের উত্তরাংশে যে নিরাপত্তা ভেঙ্গে পড়েছে, সেজন্যে ইসরাইলি এবং ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা পরস্পরকে দোষারোপ করছেন।

এক বিবৃতিতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, তারা কেবল তখনই গুলি চালিয়েছে, যখন আর কোনো উপায় সামনে ছিল না, কারণ তাদেরকে সেখানে প্রতিদিন ‘সহিংস দাঙ্গা এবং সন্ত্রাসবাদের’ মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

গত অগাস্টে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকারবিষয়ক তৎকালীন প্রধান মিশেল ব্যাচেলেট বলেছিলেন, ‘অনেক হত্যাকাণ্ডই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মনে হচ্ছে এবং সেখানে জবাবদিহিতার কোনো বালাই নেই।’

বিবিসি যেসব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যাটি পেয়েছে, তাতে অনেক তথ্যসূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এতে মাঠ পর্যায় থেকে বিবিসির লাইভ কভারেজের তথ্য যেমন আছে, তেমনি আঞ্চলিক গণমাধ্যম থেকে পাওয়া খবর এবং সরকারি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যও আছে, তবে এগুলো ভিন্ন সূত্র থেকে যাচাই করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার দেয়া তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।

পশ্চিম তীরে নিহত সবচেয়ে কম বয়সী ফিলিস্তিনি ছিল ১৪ বছরের মোহাম্মদ সালাহ। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে বেথলেহেমের ইসরাইলি নিরাপত্তা প্রাচীরের সন্নিকটে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে সে নিহত হয়।

আইডিএফ অভিযোগ করছে, মোহাম্মদ সালাহ রাস্তায় পেট্রোল বোমা ছুঁড়ছিল, তবে এটি ঠেকাতে তাদের কেন প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করতে হলো, সেটি তারা বলেনি। তবে পরিবার বলছে, মোহাম্মদ সালাহকে যখন গুলি করে হত্যা করা হয়, তখন সে রাস্তার কাছে ছিল না।

নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক দুজন হচ্ছেন ৮০ বছর বয়সী দুই ফিলিস্তিনি, যারা দুটি পৃথক ঘটনায় নিহত হন। এদের একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান ওমর আসাদ। গত জানুয়ারিতে যখন তাদের গ্রামে ইসরাইলি বাহিনী অভিযান চালাচ্ছিল, তখন তাকে হাত-পা বেঁধে, মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। তখন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এরপর ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা দুজন অফিসারকে বরখাস্ত করেছে এবং তাদের ফাইল সামরিক তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে।

মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ ২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এরপর এবছরের মারাত্মক সহিংসতা ইসরাইলের রাস্তাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

ইসরাইলের রাস্তায় এসব হামলা চালিয়েছিল ইসলামিক স্টেট গ্রুপের আরব-ইসরায়েলি সমর্থকরা এবং জেনিন এলাকা থেকে আসা ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীরা।

সবচেয়ে মারাত্মক হামলাটি চালানোর দাবি করেছিল চরমপন্থী ফিলিস্তিনি গ্রুপ আল-আকসা মার্টার্স ব্রিগেড। আর তাদের হামলার প্রশংসা করেছিল অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি এলাকা গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস এবং অন্য আরেকটি গ্রুপ ইসলামিক জিহাদ। এই তিনটি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকেই ইসরাইল এবং পশ্চিমা দেশগুলো সন্ত্রাসবাদী বলে তালিকাভুক্ত করেছে।

ইসরাইলি বাহিনী এরপর তাদের অপারেশন ব্রেকওয়াটার নামের অভিযান শুরু করে। সেসময়ের ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত বলেছিলেন, তিনি হুমকি মোকাবেলায় ইসরাইলি বাহিনীকে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ দিয়েছেন। তার ভাষায়, ইসরাইলি বাহিনীর জন্য এই যুদ্ধে ‘কোনো সীমা নেই বা কোন সীমা থাকবে না।’

অসম যুদ্ধ
ইসরাইলি বাহিনী তাদের তল্লাশি অভিযান বা শাস্তি হিসেবে বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেলার অভিযান চালানোর সময়েই এই ১০০ জনের বেশিরভাগ নিহত হয়।

এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ঘটনা ঘটেছিল পশ্চিম তীরের জেনিন, নাবলুস বা এর আশপাশের গ্রামে।

নিহতদের মধ্যে প্রায় এক তৃতীয়াংশ ছিল সশস্ত্র উগ্রপন্থী। বেশিরভাগে ক্ষেত্রেই ইসরাইলি সেনারা এদেরকে গুলি বিনিময় বা এরকম গোলাগুলি থেমে যাওয়ার পর হত্যা করেছিল।

তবে আইডিএফ আসলে কখনোই বিস্তারিতভাবে বলে না ঠিক কী ঘটেছিল।

ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সুসংগঠিত সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সমর্থনপুষ্ট তরুণ বন্দুকধারীরা জেনিন ব্রিগেডের সাথে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে নাবলুসে জঙ্গিরা অটোমান আমলের সরু গলিতে টহল দেয়, তারা নিজেদেরকে ‘সিংহ দুর্গ’ বলে পরিচয় দেয়।

গত গ্রীষ্মে ইসরাইলি বাহিনী এই গ্রুপের ১৯ বছর বয়সী নেতা ইব্রাহিম আল-নাবলুসিকে টার্গেট করে। লায়ন অব নাবলুস নামে পরিচিত এই তরুণ তার টিকটক ভিডিওর জন্য পরিচিত ছিল। তার ভিডিওগুলো ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বেশ ভাইরাল হয়েছিল।

ইসরাইলি সেনারা ৯ অগাস্ট সেখানে অভিযান চালায়, তার গোপন আস্তানা ঘেরাও করে এবং কাঁধ থেকে ছোঁড়া যায় এমন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এই হামলায় ইব্রাহিম আল-নাবলুসি নিহত হয়, সাথে মারা যায় আরেক বন্দুকধারী।

নাবলুসের আশে-পাশে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু বন্দুক হামলার জন্য ইসরাইল আল-নাবলুসিকে খুঁজছিল। আরো দুজন ফিলিস্তিনি এই অভিযানের সময় নিহত হয়, যাদের মধ্যে ছিল ১৬ বছরের এক বালক।

এই ভবনটির ধ্বংসাবশেষ এখন তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে, যেখানে গিয়ে বন্দুকধারীরা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে।

কিন্তু ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আমোস হারেলের মতে, এটি এক অসম যুদ্ধ, কারণ ইসরায়েল সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।

তিনি বলেন, হামলার হুমকি ঠেকাতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দুটি কাজ করেছে : তারা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রাচীর বরাবর বিপুল সৈন্য মোতায়েন করেছে, এরপর তারা ব্যাটালিয়ন এবং কমান্ডো ইউনিটগুলোকে প্রস্তুত রেখেছে যেকোনো সময় ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে অভিযান চালানোর জন্য। গত মার্চে যখন ইসরাইলি বাহিনী জেনিনে অভিযান চালায় তখন হারেল একটি সেনাদলের সাথে খবর সংগ্রহের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। ‘মোটর সাইকেলে তরুণরা তখন ইসরাইলি জিপের খুব কাছে চলে আসছিল, অনেকে কেবল ২০ হতে ৩০ মিটার পেছনে ছিল, এবং তারা গুলি করছিল,’ তিনি বিবিসিকে বলছিলেন। ‘আগের চেয়ে এটা একেবারেই ভিন্ন এক পরিস্থিতি। এরা যুদ্ধ করতে চায় এবং মরতে প্রস্তুত।’

‘জীবন অনেক বদলে গেছে’

এ বছর পশ্চিম তীরে ১৯ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। এদের বেশিরভাগকেই ইসরাইলি সেনারা তাদের সামরিক অভিযানের সময় বা ইসরাইলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের সময় গুলি করে হত্যা করে।

এক বালককে হত্যা করা হয় যখন সে নাকি হাতুড়ি দিয়ে এক ইসরাইলি সৈন্যের ওপর হামলা চালাতে যাচ্ছিল।

মানবাধিকার গোষ্ঠী ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল (ডিসিআই) প্যালেস্টাইন বলছে, নিহত শিশুদের এই সংখ্যা প্রমাণ করে ইসরাইলি সেনারা ‘মোটেই আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির তোয়াক্কা করছে না।’

গত জুলাই মাসে ১৬ বছর বয়সী আমজাদ নাসরকে আল মুঘাইয়ির গ্রামের কাছে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখানে ইসরাইলি বসতি-স্থাপনকারীদের সাথে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হয়, কারণ এই ইসরায়েলিরা কাছাকাছি জায়গায় বেআইনি বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছিল।

ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের প্রায়ই সংঘাত হয়, উভয়েই পরস্পরের দিকে ঢিল-পাথর ছোঁড়ে। অন্তত একজন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীর কাছে একটা মেশিনগান ছিল।

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আমজাদ যে মুহূর্তে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল, তখন তিনি গুলির শব্দ শুনে পালিয়ে যাচ্ছিলেন।

কাছাকাছি এক ইসরাইলি সেনাকে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এটা পরিষ্কার নয়, কে আসলে গুলিটি করেছিল। আমজাদের পরিবার দাবি করছে, একজন ইসরায়েলি বসতি-স্থাপনকারী এই গুলি চালায়।

আমজাদের বাবা নাশাত নাসর বিবিসিকে বলেন, তিনি তার ছেলের মৃত্যুর ব্যাপারে ইসরাইলি বাহিনীর দিক থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাননি।

তিনি বলেন, ‘আমজাদের মৃত্যুর পর আমার জীবন অনেক বদলে গেছে। আমি ক্যান্সারে ভুগছি, আমাকে সাহায্য করার জন্য সে স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। ও পরিবারকে অনেক সাহায্য করত।’

বিবিসি এই ঘটনার ব্যাপারে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কাছে জানতে চেয়েছিল। তারা বলছে, এই ঘটনা ‘যাচাই’ করে দেখা হচ্ছে এবং তারা বিবিসিকে একটি ভিডিও এবং ছবি ফরোয়ার্ড করে পাঠিয়েছে। এতে দেখা যায়, ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলি গাড়ির ওপর পাথর ছুঁড়ছে। এর সাথে আমজাদকে হত্যার ঘটনার সম্পর্ক কী, যে কিনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা জায়গায়, সে প্রশ্নের উত্তর তারা দেয়নি।

ইসরাইলি বাহিনীর হাতে যেসব হত্যার ঘটনা ঘটছে, সেগুলো তারা কতটা তদন্ত করতে চায়, বা তাদের দক্ষতা নিয়ে এবছর অনেক প্রশ্ন উঠছে।

জেনিনে ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আকলের হত্যাকাণ্ডের পর ইসরাইলি কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে অনেক ধরণের বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিলেন। পরে এক অভ্যন্তরীণ তদন্তে এরকম মিথ্যা দাবি করা হয় যে একজন সৈনিক ভুল করে তার দিকে গুলি চালিয়েছিল। কারণ শিরিন আবু আকলেহ যেদিকটায় ছিলেন, উগ্রবাদীরা সেদিক থেকে এই সৈনিকের দিকে গুলি করছিল।

আইডিএফ সবসময় দাবি করে যে তারা বেসামরিক মানুষ এবং সৈনিকদের রক্ষা করতে গিয়ে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন তল্লাশি অভিযান, সহিংস দাঙ্গা মোকাবেলার সময় গুলি চালানোর অধিকার তাদের আছে বলেও যুক্তি দেন ইসরাইলি কর্মকর্তারা।

আইডিএফ আরো দাবি করছে, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা এবং বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে বন্দুক হামলা গত বছরের তুলনায় তিন গুন বেড়েছে। তারা দাবি করছে, তাদের অপারেশন ব্রেকওয়াটারের কারণে ৫৫০টি হামলা প্রতিরোধ করা গেছে, কিন্তু এর বিস্তারিত কোন তথ্য তারা দেয়নি।

আইডিএফ তাদের তল্লাশি অভিযানগুলোর সময় গত এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত দেড় হাজার ফিলিস্তিনিকে গ্রেফতার করেছে।

ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠন আল-হকের কর্মকর্তা আসিল আলবাজেহ বলেন, ইসরাইলি অভিযানের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের ফিলিস্তিনিদের সবাইকেই যেন একসাথে সাজা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে ফিলিস্তিনিদের চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে, ইসরাইলে ঢোকার সামরিক তল্লাশি চৌকি বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে, ওয়ার্ক পারমিট দেয়া হচ্ছে না আর বিনা বিচারে ফিলিস্তিনিদের আটকে রাখা হচ্ছে।

অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার তাদের প্রিয়জন কেন নিহত হয়েছে, তার ব্যাখ্যা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে।

৪৭ বছর বয়সী এক বিধবা গাদা সাবাতিয়েনকে ইসরাইলি সেনারা খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করেছিল। ইসরাইলিরা বলছে, তাকে থামার নির্দেশ দেয়ার পরও তিনি সেটি অমান্য করেছিলেন। গত ১০ এপ্রিল বেথলেহেমের কাছে হুসান গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছিল।

গাদা সাবাতিয়েন ছিলেন নিরস্ত্র। পরে জাতিসঙ্ঘ মানবিক সংস্থার এক তদন্তে বলা হয়েছিল, তিনি চোখেও ভালো করে দেখতে পেতেন না। আইডিএফ পরে বলেছিল, তারা এ নিয়ে একটি তদন্ত শুরু করেছে।

ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো সেখানে কোনো যুদ্ধাপরাধ করছে কিনা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তা তদন্ত করছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, তারা এবছরের আরো অনেক হত্যার ঘটনা এই তদন্তের তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা করবে।

গত অগাস্টে গাজা ভূখণ্ডে ইসরাইলি বাহিনী এবং ইসলামিক জিহাদের মধ্যে এক সামরিক সংঘাতের সময় আরো ৪৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়।

এ বছর ইসরাইলের ভেতর হামলা চালাতে গিয়ে যে ফিলিস্তিনিরা নিহত হয়েছেন, তাদেরকে এই ১০০ জন নিহত ফিলিস্তিনির তালিকার মধ্যে ধরা হয়নি।
সূত্র : বিবিসি

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here