পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা রোধে ইসলামের নির্দেশনা

0
81
আতাউর রহমান খসরু

(দিনাজপুর২৪.কম) পরিবার মানব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি পারিবারিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে পৃথিবীতে মানবজাতির যাত্রা শুরু হয়। মহান আল্লাহ পৃথিবীতে প্রথম মানব আদম (আ.) ও প্রথম মানবী হাওয়া (আ.)-কে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ করে প্রেরণ করেন এবং পারিবারিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতার বিকাশ ঘটে। ইসলাম মানবজাতিকে পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

পারিবারিক বন্ধন বিচ্ছিন্নকারীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে।

পারিবারিক বন্ধন আল্লাহর অনুগ্রহ : পরিবার ও পারিবারিক বন্ধন আল্লাহর অনুগ্রহ। সুতরাং তা অটুট রাখা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং আল্লাহ তোমাদের থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে তোমাদের জন্য পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন। ’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৭২)

পরিবার মানুষের আশ্রয় : পরিবার-পরিজন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আশ্রয়। পরিবার মানুষের বৈষয়িক ও মানসিক আশ্রয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে আছে যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সঙ্গিনীদের, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য তাতে বহু নিদর্শন আছে। ’ (সুরা রোম, আয়াত : ২১)

পারিবারিক সম্পর্কে বিপর্যয় থেকে রক্ষা : পারিবারিক সম্পর্ক অটুট থাকলে মানুষ বহু ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। কেননা তারা পরস্পরকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আত্মীয়গণ আল্লাহর বিধানের একে অন্য অপেক্ষা অধিক হকদার। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক অবহিত। ’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৭৫)

পারিবারিক বন্ধন রক্ষায় বৈষয়িক লাভ : বর্তমান সময়ে বহু মানুষ পার্থিব লাভ-ক্ষতির বিবেচনা করে পরিবার-পরিজনকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) সম্পর্ক রক্ষাকারীর জন্য পার্থিব কল্যাণের সুসংবাদ দান করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)

ধর্মের নামেও বিচ্ছিন্নতা নয় : ইসলাম পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন অনুমোদন করে না। এমনকি আল্লাহর অধিক ইবাদতের জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অনুমতি নেই। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘ইসলামে বৈরাগ্যবাদের কোনো স্থান নেই। বিয়ে পরিহারের কারণে মানুষ বহু কল্যাণ ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়। ’ (ফিকহুস সুন্নাহ : ৩/৩৬)

কষ্ট হলেও পরিবার থেকে দূরত্ব নয় : পারিবারিক জীবনে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়। ভুল বোঝাবুঝি ও মতভিন্নতা দেখা দেয়। ইসলাম এমন সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে পারিবারিক জীবনযাপনের নির্দেশ দেয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের সঙ্গে সত্ভাবে জীবনযাপন করবে, তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো, তবে এমন হতে পারে যে আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ। ’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৯)

পারিবারিক সংকট দূরের উদ্যোগ : পারিবারিক জীবনে কোনো সংকট দেখা দিলে তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তোমরা তার পরিবার থেকে একজন ও তার পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করবে; তারা উভয়ের নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত। ’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৫)

উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়; বরং পরিবারের সন্তান-সন্তুতিদের মধ্যে মনমালিন্য তৈরি হলে পরিবারের অভিভাবকরা দ্রুততম সময়ে তা সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।

আত্মীয়তার ব্যাপারে উদাসীনতা নয় : আত্মীয়-স্বজন ও পারিবারিক সম্পর্কের ব্যাপারে উদাসীনতা কাম্য নয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় কোরো, যার নামে তোমরা পরস্পরের কাছে যাঞ্চা কোরো এবং সতর্ক থাকো আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষ দৃষ্টি রাখেন। ’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১)

সুসম্পর্ক ঈমানের নিদর্শন : আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক মুমিনের ঈমানের বহিঃপ্রকাশ। মুমিন কখনো তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৮)

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার অর্থ : সাধারণত মানুষ তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক রক্ষা করে, যে তার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তি হলো প্রতিদান দানকারী। বিচ্ছিন্নতার পর যে সম্পর্ক রাখে সেই প্রকৃত আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষাকারী। ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রতিদানকারী আত্মীয় হক সংরক্ষণকারী নয়; বরং আত্মীয়তার হক সংরক্ষণকারী সে ব্যক্তি, যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পরও তা বজায় রাখে। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৯১)

দায় নয়, দায়িত্ব : পারিবারিক ব্যয় নির্বাহকে অনেকে সামাজিক দায় মনে করেন। কিন্তু ইসলাম একে দায়িত্ব আখ্যা দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকে কি ব্যয় করবে সে সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে। বলুন, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য। উত্তম কাজের যা কিছু তোমরা কোরো না কেন আল্লাহ তো সে সম্পর্কে অবহিত। ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১৫)

পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার প্রতি হুঁশিয়ারি : আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারীদের প্রতি পবিত্র কোরআনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, ‘ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। আল্লাহ তাদেরই অভিশাপ করেন আর করেন বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন। ’ (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২২-২৩)

সম্পর্কচ্ছেদের ভয়াবহ পরিণতি : আত্মীয়তা ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণতি ভয়াবহ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আত্মীয়তা ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। ’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৫৬)

আল্লাহ আমাদের পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা রক্ষা করুন। আমিন।

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here