বছরজুড়েই বায়ুদূষণের শীর্ষ তালিকায় ঢাকা

0
82

(দিনাজপুর২৪.কম) গত বছরজুড়েই বায়ুদুষণে বিশ্বে শীর্ষ ১০ দেশের শহরের মধ্যে রাজধানীর ঢাকার অবস্থান ছিল। এর মধ্যে ১০৪ দিন ছিল দূষণে বিশ্বে প্রথম আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ১১৭ দিন এবং তৃতীয় অবস্থানে ছিল বছরের ১৩৫ দিন। আর বাকি এক দিন দূষণের বিশ্ব ইনডেক্সে চার থেকে আটের মধ্যে ছিল। ভরা বর্ষার দিনগুলোতেও দূষণে প্রথম ছিল ঢাকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট) প্রকল্পের মার্চ মাসের গবেষণায় এমন তথ্য এসেছে। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটে প্রকাশিত ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স’-এ বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের কারণে সারাদেশে মানুষের গড় আয়ু কমেছে প্রায় পাঁচ বছর চার মাস আর ঢাকায় কমেছে প্রায় সাত বছর সাত মাস। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর ছয় মাস। লাইফ ইনডেক্সের গবেষণা মতে, ১৯৯৮ সালে বায়ুদূষণের কারণে গড় আয়ু কমেছিল প্রায় দুই বছর আট মাস, ২০১৯ সালে সেটি পাঁচ বছর চার মাসে দাঁড়ায়। গবেষণা বলছে, সারাদেশে বায়ুদূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী অন্তত তিনগুণ বেশি। দূষিত বাতাসে কঠিন ও তরল পদার্থ উড়ে বেড়ায়, যার মধ্যে রয়েছে কাচ, ধোঁয়া বা ধুলা। যা ‘বস্তুকণা’ হিসেবে পরিচিত। বস্তুকণার মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলা হচ্ছে-বস্তুকণা ২.৫। যা মানুষের চুলের ব্যাসের মাত্র তিন শতাংশ, যেটি মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। বছরজুড়েই ঢাকার বাতাসে ‘বিষ’ উড়ে বেড়ায়। বায়ুদূষণে মানুষের আয়ু গড়ে তিন বছর কমছে। বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃতু্যর ক্ষেত্রে চতুর্থ প্রধান কারণ এখন বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণে দেশে বছরে এক লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃতু্য হয়। বায়ুদূষণে শিশুমৃতু্যর হার সর্্েবাচ্চ। এছাড়া বায়ুদূষণে দেশের জিডিপির পাঁচ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত পুরো সময়টায় দূষণের মাত্রা থাকে বিপজ্জনক অবস্থায়। আর বাকি পাঁচ মাস থাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায়। যার অর্থ ঢাকা শহরের সবাই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন। এর মধ্যে রাজধানীর পুরান ঢাকার আশপাশের এলাকায় দূষণ সবচেয়ে বেশি। এরপর আবাসিক এলাকা ধানমন্ডি, গুলশান, বাড্ডা ও বনানীতে দূষণের মাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। সবচেয়ে বেশি দূষিত এলাকা হচ্ছে এখন বারিধারা-আমেরিকান অ্যাম্বাসির কাছাকাছি এলাকা। এছাড়া মিরপুর, আগারগাঁও, গাবতলী, উত্তরা, এয়ারপোর্ট, মহাখালী, বিজয়নগর, মতিঝিল ও গুলিস্তানে দূষণ দিনের পর দিন বাড়ছে। ঢাকার বাইরে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে-খুলনা, রাজশাহী, যশোর, নারায়ণগঞ্জ, পাবনা ও গাজীপুর। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, সারাদেশে ইটভাটা আছে প্রায় ৮ হাজার। আর ঢাকার আশপাশের এলাকাগুলোতে রয়েছে সাড়ে ৭০০টির বেশি ইটভাটা। ইটভাটাগুলো প্রতি মৌসুমে ২৫ লাখ টন কয়লা ও ২২ লাখ টন জ্বালানি কাঠ পোড়ায়। ইটভাটার দূষণে ৮৮ লাখ ৮৬ হাজার টন গ্রিন হাউস গ্যাস হয়। ঢাকায় বায়ুদূষণের জন্য এককভাবে ইটভাটা প্রায় ৫৮ শতাংশ দায়ী। এছাড়া নির্মাণকাজ, যানবাহন, সড়ক ও মাটি থেকে সৃষ্ট ধুলার মাধ্যমে ১৩ শতাংশ, বিভিন্ন জিনিসপত্রসহ পস্নাস্টিক পোড়ানোর ফলে ৫ শতাংশ এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের দূষিত বায়ু পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার হয়ে ঢাকার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে ২৪ শতাংশ দূষণে ভুগছে ঢাকা। নাসার তথ্য অনুযায়ী গত ১০ বছরে ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়েছে ৮৬ শতাংশ। বারডেম হাসপাতালের চর্ম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শায়লা শারমিন যায়যায়দিনকে বলেন, নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ঢাকায় বায়ুদূষণ ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এ সময় শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, চুলকানিসহ বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত রোগী বেশি আসেন। এ সময়টায় উত্তরের হিমেল বাতাস প্রবাহিত হয়। তখন বিষাক্ত বাতাস শ্বাস নেওয়ার সময় ফুসফুসে ঢুকে পড়ে। এ কারণে মানুষ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, চুলকানিসহ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ বৃদ্ধি পায়। বয়স্করা হাঁপানি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। নির্মল বায়ু টেকসই করা গেলে বায়ু দূষণ কমবে বলে মনে করেন তিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার বাতাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২৫০ মাইক্রোগ্রাম ধুলোকণা ভেসে বেড়ায়। সহনীয় মাত্রার চেয়ে এই পরিমাণ পাঁচ গুণ বেশি। বায়ুদূষণে রাজধানীর ৭১ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন। বায়ুদূষণজনিত ক্যানসারসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা রোগ বাড়ছে। দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় ও স্নায়ুগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। অনেকের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ফুসফুসে ও হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের শরীরে নানা রোগবালাই যেমন বাসা বাঁধছে, তেমনি মনের মধ্যেও রোগশোকের জন্ম দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে মানুষের বিষণ্নতা। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। অসুস্থ শিশুর জন্ম হচ্ছে। একিউআই বিশ্ব এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, একিউআই স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে নগরবাসীর প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। জনবহুল ঢাকা কয়েক বছর ধরেই দূষিত বাতাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। মূলত নির্মাণকাজের নিয়ন্ত্রণহীন ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটার দূষণ প্রভৃতি কারণে রাজধানীতে দূষণের মাত্রা রয়েছে চরম বিপর্যয়ের মধ্যে। একিউআই বিশ্বের ১০৬টি দেশের বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করে। পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডোর মহাসচিব ডক্টর শাহরিয়ার হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত দ্বারা বেষ্টিত। শ্রীষ্ম, বর্ষা, শীতজুড়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে দূষিত বায়ু ঢাকা হয়ে প্রবাহিত হয়। শীতকালে (নভেম্বর-জানুয়ারি) উত্তর-পশ্চিম বায়ুর প্রভাবে দূষিত পার্টিকুলেট ম্যাটারের পরিমাণ বেড়ে যায়। শীতকালে গতিশীল বাতাসে দূষিত বায়ুকণার প্রভাব সর্বোচ্চ থাকে, যা উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে ঢাকা, কুমিলস্না, ময়মনসিংহ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছায়। বায়ুদূষণে বিকলাঙ্গতা, শ্বাসযন্ত্রের দুর্বলতাজনিত কারণে মৃতু্য, স্ট্রোক, ফুসফুস ক্যানসার, ডায়াবেটিসসহ নিউমোনিয়ার মতো ছোঁয়াচে রোগে ভুগছে মানুষ। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাতাসে বস্তুকণা ২.৫-এর পরিমাণ ৭৭.১ মাইক্রোগ্রাম পার কিউবিক মিটার, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদন্ডের চেয়ে সাতগুণ বেশি। দেশের ৬৪টি জেলার প্রত্যেকটিতেই বায়ুদূষণের হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী তিনগুণ বেশি। শহরে বস্তুকণার মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বলা হয়, অতিসূক্ষ্ণ বস্তুকণা ২.৫। যা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ঢুকে যায়। শ্বাস কষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ। বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস নিতে গিয়ে মানুষ প্রতিদিন ফুসফুসের মাধ্যমে দুই হাজার লিটারের বেশি দূষিত বাতাস গ্রহণ করে থাকেন। এই শ্বাস গ্রহণের সময়েই ফুসফুসে ঢুকছে দূষিত বস্তুকণা। দূষিত বায়ুর এ বস্তুকণা মানুষের মৃতু্যকে ত্বরান্বিত করছে। বিশ্বব্যাংক দেশের বায়ুদুষণ কমাতে দুই দফায় প্রায় আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দিয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) জিয়াউল হক যায়যায়দিনকে বলেন, প্রতিবেশী দেশের দূষণসহ উন্নয়নকাজ, ইটভাটার দূষণ, একাধিক বার ফসল উৎপাদন, শিল্পকারখানার দূষণ ও সিমেন্ট কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। বায়ুদূষণ এখন ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মানিকগঞ্জসহ দেশের প্রধান বড় শহরগুলোতে অব্যাহত থাকে সারা বছর। তিনি আরও বলেন, রাজধানী ঢাকায় বায়ুদূষণ রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় একাধিকবার হাইকোর্ট হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সচিবদের তলব পর্যন্ত করেন হাইকোর্ট। পরিবেশ অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ ইটভাটা ভাঙা, যেখানে-সেখানে নির্মাণসামগ্রী ফেলে দূষণ করা কাজে জরিমানা আদায় করলেও দূষণ বন্ধ হয়নি। নির্মাণসামগ্রী ঢেকে কাজ করার আহ্বান জানানো হলেও তা মানছে না।-অনলাইন ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here