ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর : এখনো আক্ষেপ সালাম পরিবারে

0
51

(দিনাজপুর২৪.কম) ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। কিন্তু এখনো নানা আক্ষেপে দিনাতিপাত করছে ফেনীর দাগনভূঞার ভাষা শহীদ আবদুস সালামের পরিবার। দীর্ঘ সময়ে তাদের কয়েকটি মাত্র চাওয়াও পূরণ হয়নি।

সালাম পরিবারের নেই দাবিগুলো হচ্ছে – আজিমপুর কবরস্থানে আবদুস সালামের চিহ্নিত করা কবর ভালোভাবে সংরক্ষণ, দাগনভূঞা বাজারের জিরো পয়েন্টকে সালাম চত্ত্বর নামকরণ, ঢাকা-ফেনী-দাগনভূঞায় একটি সড়ক সালামের নামে নামকরণ।

এদিকে, স্থানীয়ভাবে শহীদ সালামের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকির অভাব ও অবহেলায় নানা সমস্যায় আছে। ১৩ বছরেও নির্মিত হয়নি ভাষাশহীদ সালাম অডিটরিয়াম।

পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ভাষাশহীদ আবদুস সালামের নামে দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামটি ‘ভাষা শহীদ সালাম অডিটরিয়াম’ নামকরণ করা হয়। নামকরণের দুই বছরের মধ্যে ভবনটি পরিত্যক্ত হওয়ায় তা নিলামে বিক্রি করা হয়। ভেঙ্গে ফেলার ১৩ বছরেও নির্মিত হয়নি নতুন অডিটরিয়াম ভবন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের মে মাসে নোয়াখালী জেলার সুধারামের ঠিকাদার মো: মামুন ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় নিলামে ভবনটি ক্রয় করেন। ঠিকাদার অডিটরিয়ামটি ভেঙ্গে নিয়ে গেলেও ১৩ বছরেও নতুন ভবন নির্মাণের পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

উপজেলা পরিষদের ওই অডিটরিয়ামটি নির্মিত না হওয়ায় এখন বিআরডিবি সংকীর্ণ পরিসরের হল রুমে যেকোন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও ওয়ার্কশপ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, অডিটরিয়ামটি নির্মাণে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে অর্থ বরাদ্দ এখনো পাননি তারা। উপজেলা প্রকৌশলী সৌরভ দাশ জানান, অর্থ বরাদ্দের চেষ্টা করা হচ্ছে।

1(00)
ছবি-সংগ্রহীত

দাগনভূঞার কৃতি সন্তান ভাষাশহীদ আবদুস সালামের ছোটভাই আবদুল করিম জানান, পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামের নাম পরিবর্তন করে ‘ভাষা শহীদ সালাম অডিটরিয়াম’ নামকরণ করা হয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে তা পরিত্যক্ত হওয়ায় ভেঙ্গে ফেলা হয়। একই স্থানে নতুন ভবন নির্মাণের কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ভাষা শহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার নিষ্প্রাণ

ফেনীর ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছে। বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বাড়ে কদর, শুরু হয় পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জা। এ ছাড়া খবর রাখে না কেউ। তাই সালামের স্মরণে তার জন্মস্থানে আরো স্থাপনা তৈরির দাবি স্থানীয়দের। তাদের মতে এটিকে দৃষ্টিনন্দন করা গেলে ফিরে পাবে প্রাণ।

স্থানীয়রা জানান, সালামের স্মৃতি রক্ষায় দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ হলেও। গ্রন্থাগারে রয়েছে পুরোনো কিছু বই। আর জাদুঘরে ভাষা শহীদের একটি ছবি ছাড়া নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন। এতে হতাশ হয়ে ফিরে যান দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা।

এদিকে গ্রাম্য পরিবেশের হওয়ায় সারা বছরই থাকছে এটি প্রাণহীন। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এলাকাটিকে দৃষ্টিনন্দন করে গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন দাগনভূঞা উপজেলা চেয়ারম্যান দিদারুল কবির রতন।

ফেনী জেলা পরিষদ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রামের নাম ‘সালাম নগর’ করা হয়। প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে শহীদ সালামের বাড়ির অদূরে নির্মাণ করা হয় ‘ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি যাদুঘর’।

২০০৮ সালের ২৬ মে স্মৃতি যাদুঘর ও গ্রন্থাগারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সাঈদ।

ভাষাশহীদ আবদুস সালাম : সংক্ষিপ্ত পরিচয়

ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামে ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর জন্ম হয় আবদুস সালামের। ৪ ভাই ২ বোনের মধ্যে সালাম সবার বড়। প্রথমে মাতুভূঞা করিম উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় ও ১৯৪২ সালে আতার্তুক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

তার পিতা ফাজিল মিয়া কৃষিজীবী ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অভাব অনটনে সালামের ম্যাট্টিক ফাইনাল পরীক্ষা দেয়া হয়নি। নিত্য অভাব দেখে সালামের রোজগারের ইচ্ছে জাগে। পাঠ চুকিয়ে জেঠাতো ভাইয়ের হাত ধরে ঢাকায় পাড়ি জমান।

সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের মতিঝিল ‘ডাইরেক্টর অব ইন্ডাষ্ট্রিজ’-এ পিয়নের চাকরি নেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে সালাম বাড়িতে আসেন এবং কিছুদিন ছুটিশেষে ঢাকায় ফিরে যান। তখন মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, মানতে হবে’ স্লোগানে রাজধানী ছিল আন্দোলনমুখর। ২৭ বছরের টগবগে যুবক সালাম জাতির জন্য, মায়ের ভাষার জন্য আন্দোলনে যোগ দেন। ছুটে যান মিছিলে।

২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সেই মিছিলে তিনিও যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত গুলিবর্ষণে লুটিয়ে পড়েন সালাম, বরকত, জব্বার, রফিক, শফিকসহ অনেকে। বুলেটবিদ্ধ সালামকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

টেলিগ্রামে খবর পেয়ে সালামের বাবা ফাজিল মিয়া, জেঠাতো ভাই হাবিব ও প্রতিবেশী মকবুল আহমদ ঢাকায় ছুটে যান। দীর্ঘদিন সংজ্ঞাহীন থাকার পর ৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরদিন সকালে নামাজে জানাজা শেষে আজিমপুর গোরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। গ্রাম থেকে আসা সালামের পিতা, জেঠাতো ভাই ও প্রতিবেশী মকবুল জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

বর্তমানে ছোটভাই আবদুল করিম সালামের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। ১৯৭৬ সালে সালামের পিতা ফাজিল মিয়া, ১৯৮২ সালে মা দৌলতের নেছা, ভাই সাহাবউদ্দিন, ১৯৯৯ সালে বোন কুরফুলের নেছা, ২০০২ সালে ভাই আবদুস সোবহান ও ২০০৭ সালের ৩ জানুয়ারি শহীদ সালামের ছোটবোন বলকিয়তের নেছা মারা যান।

শহীদ সালামের ছোটভাই সুবেদার (অব:) আবদুল করিম জানান, সালামের স্মৃতিচিহ্ন বলতে কিছুই নেই। রক্তমাখা শার্ট আর একটি ছবি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য খাজা আহমদ নিয়ে আর ফেরত দেননি। তিনি বলেন, আজিমপুর কবরস্থানে সালামের চিহ্নিত করা কবরটি যেন আজীবন সংরক্ষণ করা হয়।

ভাষা শহীদ সালাম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক শাহাদাত হোসাইন শহীদ সালামের পরিবারের দাবি পূরণে সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতার আহ্বান জানান।

ফেনী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুল বাশার তপন জানান, ২০২০ সালে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে স্থানীয় একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির পর শহীদ সালামের পরিবারকে ঢাকায় সংবর্ধনা দেয়া হয়। ২০০০ সালে সরকার শহীদ আবদুস সালামকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করেন। এছাড়া আর কোনো সম্মাননা শহীদ পরিবারকে দেয়া হয়নি।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এখন সারা পৃথিবীর ১৮৮ দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনে সালাম, বরকত, রফিক, জাব্বার, শফিকসহ যারা প্রাণ দিয়ে রক্তের বিনিময়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে, সালামসহ তাদের পরিবারের চাওয়াগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সকলের দাবি। সূত্র : নয়া দিগন্ত

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here