রংপুর সিটিতে আবার লাঙলেই আস্থা

0
37

(দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম) অনিয়ম ও বড় গোলযোগ ছাড়াই রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীতের সকালে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত আধুনিক যন্ত্রে ভোটদানে ধীরগতির ছাড়া তেমন অভিযোগ মেলেনি। দলীয় প্রতীকের এ ভোটে মেয়র পদে বিএনপি ছাড়াই নয়জন মেয়র পদে লড়াই করেছেন। শেষ খবর অনুয়ায়ী, এবারও এগিয়ে লাঙল।

গতকাল রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত প্রাপ্ত বেসরকারি তথ্য অনুসারে, ২২৯ কেন্দ্রের মধ্যে ১০০ কেন্দ্রে লাঙল নিয়ে লড়াই করা মো. মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন ৫৯ হাজার ২৫৫ ভোট। তার নিকটকম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাতপাখ নিয়ে মো. আমিরুজ্জামার পেয়েছেন ২১ হাজার ১৯৬ ভোট। নৌকা প্রতীকে হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া পেয়েছেন ৯ হাজার ৮২৫ ভোট।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। গতকাল ভোটগ্রহণ শেষে আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সিইসি বলেন, ভোটার উপস্থিতি ব্যাপক ছিল। স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।

সিইসি বলেন, বিকাল সাড়ে চারটার মধ্যে ভোট শেষ হয়েছে। ধীরগতির অভিযোগ অসত্য নয়। এখন যে অবস্থা দেখেছি অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এটা শেষ করতে রাত ৭-৮টা গড়িয়ে যেতে পারে। ভোট শেষে হওয়ার পর চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, চারটা পর্যন্ত কোথাও ৬৭ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে খবর পাচ্ছি, আবার কোথাও ৩৯ শতাংশও পাচ্ছি। এভারেজ অনুমান করছি এটা ৫০-৫৫ শতাংশ। শেষ পর্যন্ত কাস্ট ৬০ শতাংশের ওপরে বা কম হতে পারে। এটা অনুমান করে বলছি। চূড়ান্ত গণনার পর দেখা যাবে কত হলো।

এবারই প্রথম রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবগুলো কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ভোটাররা। সঙ্গে প্রতিটি কেন্দ্র ও কক্ষে বসানো হয়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরা। এর আগে ২০১৭ সালের নির্বাচনে একটি মাত্র কেন্দ্র ছাড়া বাকি ১৯২টি কেন্দ্রে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার সকালে ভোট শুরুর সময় নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের আলমনগর কলেজ রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করে ভোটারদের লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ভোটের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

পাশাপাশি মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যাজ পরা কর্মী-সমর্থকদের কেন্দ্রের বাইরে জড়ো হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোরালো উপস্থিতিও দেখা গেছে।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা রিটার্নিং অফিসার আবদুল বাতেন জানিয়েছেন, ভোট ঘিরে কেন্দ্রে কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রতি সাধারণ কেন্দ্রে ১৫ জনের এবং ৮৬টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৬ জনের ফোর্স মোতায়েন রাখা হয়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। ১ হাজার ৮০৭ সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে রংপুর এবং ঢাকায় নির্বাচন অফিস থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও কোনো অনিয়ম দেখতে পেলেই গাইবান্ধা-৫ উপনির্বাচনের মতো ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন এ রিটার্নিং অফিসার।

এদিকে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ত্রুটির কারণে ভোট গ্রহণে ধীরগতি লক্ষ করা যায়। ভোটাররা দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে পড়েছেন চরম বিড়ম্বনায়। সকাল ৯টায় ইভিএম ত্রুটির কারণে ভোট দিতে পারেননি রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জাতীয় পার্টির মনোনীত মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিনি রংপুর নগরীর আলমনগর কলেজ রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে ভোট দিতে পারেননি। মোস্তফা ভোট কক্ষে প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থান করে ভোট দিতে না পেরে বাইরে এসে সাংবাদিকদের সামনে ইভিএম নিয়ে হতাশা ও

অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় মোস্তফা বলেন, আমি সকাল ৯টায় কেন্দ্রে এসেছি। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখি ইভিএম হ্যাং করেছে। কিন্তু এর আগে আমার হাতের আঙুলে ভোটগ্রহণের কালি দেওয়া হয়। আমি ১৫ মিনিটের মতো অপেক্ষা করেও ভোট দিতে পারিনি। তিনি বলেন, অবস্থা যদি এই হয়, তা হলে মানুষ ভোট দেবে কীভাবে? আমি ভোট না দেওয়ার বিষয়টি এখানকার প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানকে অবগত করেছি। তিনি ভোট কেন্দ্রের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ভোটাররা এসে বিভ্রান্ত হচ্ছে। কে কোন কক্ষে গিয়ে ভোট দেবে সেটা বোঝা মুশকিল। কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমরা চাই, সবাই সুন্দর সুষ্ঠু পরিবেশ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক। মেয়র প্রার্থী মোস্তফার অভিযোগের ভিত্তিতে কেন্দ্রের একটি বুথের ইভিএম যন্ত্র ঠিক করা হয়। সকাল ৯টা থেকে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর অবশেষে সাড়ে ৯টায় তিনি তার ভোট প্রয়োগ করেন। এ ব্যাপারে আলমনগর কলেজ রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আসাদুজ্জামান বলেন, একটি কক্ষে এ সমস্যা হয়েছে, সবগুলোতে নয়। মেয়র প্রার্থী মোস্তফার ভোট দেওয়ার সময় ইভিএমে ত্রুটি হয়েছিল এ কথা ঠিক, তবে এর কিছুক্ষণ পর ইভিএমের ত্রুটি দূর করা হয়। অবশেষে আধা ঘণ্টা পর মেয়র প্রার্থী মোস্তফা ভোট দিয়েছেন।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা মার্কার মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া বলেছেন, ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। নগরবাসী আজ উন্নয়নের স্বার্থে বিপুল ভোটে নৌকাকে বিজয়ী করবেন। সকাল সাড়ে ৯টায় নগরীর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ভোটের পরিবেশ চমৎকার রয়েছে। উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নগরবাসী ভোট দিতে কেন্দ্রে আসছেন। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। ডালিয়া আরও বলেন, বিজয়ী হয়ে আমি নগরবাসীকে দেওয়া ইশতেহারগুলো বাস্তবায়ন করে একটি তিলোত্তমা নগরী হিসেবে রংপুর সিটি করপোরেশনকে গড়ে তুলব।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণে ইভিএমের কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ ভোটারদের। বিশেষ করে আঙুলের ছাপ মিলছে না অনেকেরই। ছাপ মেলাতে গিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আসতে পরামর্শ দিচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। দুপুরে সরেজমিনে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ে কেন্দ্রে দেখা যায়, কেন্দ্রের পাশের নলকূপ পাড়ে লোকজনের ভিড়। কেউবা নলকূপ চাপছেন। আবার কেউবা সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিচ্ছেন। এ সময় তাদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, আঙুলের ছাপ না মেলায় কর্মকর্তাদের পরামর্শে হাতের আঙুল ভালোভাবে পরিষ্কার করছি। যাতে মেশিনে আঙুলের ছাপ মেলে। আনসার সদস্যরাও ভোটারদের উদ্দেশে বলছেন, সবাই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আসুন, না হলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। ওই কেন্দ্রে শেফালী বেগম নামের এক নারী বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভোট দিতে আসেন। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে যখন আঙুলের ছাপ দিতে যান তখন তা আর মিলছিল না। বারবার চেষ্টা করেও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা ব্যর্থ হচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তারা বলেন, আপনি বাইরে গিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে একটু পরে আসুন। একই কেন্দ্রে দলিচা বেগম নামে আরও এক নারী ভোটারের বারবার চেষ্টার পরও আঙুলের ছাপ মেলেনি। এ বিষয়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা জানান, বয়স্ক প্রায় সব ভোটারেরই সমস্যা হচ্ছে। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে আসার পর অনেকের ছাপ মিলছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শেষ হওয়ার কথা বিকাল সাড়ে ৪টায়। তবে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অনেক কেন্দ্রে ভোটারদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হলেও এসব কেন্দ্রে শেষ হয়নি ভোটগ্রহণ। কখন এ ভোটগ্রহণ শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করে বলাও সম্ভব হচ্ছে না। বিকাল সাড়ে ৫টায় আশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রংপুর মেট্রোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ, আলমনগর স্টেশন রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশকিছু কেন্দ্রে গিয়ে ভোটারদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। ইভিএমের নানা ত্রুটির কারণে এমনটা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা। মেট্রোপলিটন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোটার মজিবর রহমান বলেন, দুপুর দেড়টায় লাইনে দাঁড়ানোর পরও ভোট দিতে পারিনি। আরও এক ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হতে পারে। লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ভোটার আনিস মিয়া বলেন, বেলা ১১টার দিকে একবার এসে একঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে গেছি। এর পর বিকাল ৩টার দিকে আবারও এসেছি। এখন পর্যন্ত ভোট দিতে পারিনি। আশরতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটার আমির হোসেন বলেন, মেশিনের চেয়ে ব্যালটে ভোট দিলে এত বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না। ইভিএমে তিন-চার গুণ বেশি সময় লাগছে। লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিসাইডিং অফিসার শাহালম বলেন, বয়স্কদের ভোট দিতে অনেক সময় লাগে। এ ছাড়া অনেকে জোরে বাটনে চাপ দেন। ফলে ইভিএম লক হয়ে যায়। এ কারণে ভোটারদের ভোট দিতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। এবার রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের ২ লাখ ১২ হাজার ৩০২ জন পুরুষ এবং ২ লাখ ১৪ হাজার ১৬৭ জন নারী ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন। আর তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার রয়েছেন একজন। এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২৬০ জন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৯ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৮৩ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের একজন কাউন্সিলর প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। মেয়র পদে ৯ প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ-ইনু) শফিয়ার রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমিরুজ্জামান পিয়াল, খেলাফত মজলিশের তৌহিদুর রহমান মন্ডল রাজু, জাকের পার্টির খোরশেদ আলম খোকন, বাংলাদেশ কংগ্রেসের আবু রায়হান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মেহেদী হাসান বনি ও লতিফুর রহমান মিলন। -ডেস্ক রিপোর্ট

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here