(দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম) সম্পন্ন হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় সংসদে পাঠাতে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ইঞ্জিনিয়ার ও চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে মনোনয়ন দিয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো, যাদের মধ্যে ছিলেন ৪৭ জন চিকিৎসক।
এর মধ্যে এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা দল ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। সংসদে জায়গা পেতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনি যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন ১৪ জন চিকিৎসক। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক বিএনপির।
তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক চিকিৎসককে মনোনয়ন দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। দলটি থেকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে লড়েছেন ২০ জন চিকিৎসক। দ্বিতীয় অবস্থানে বিএনপি। দলটি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন ১৩ চিকিৎসক।
চিকিৎসকদেরকে মনোনয়ন দেওয়ার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন ১০ চিকিৎসক। এরপর রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির শাপলা কলি প্রতীকে প্রার্থী ছিলেন দুজন চিকিৎসক। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনয়ন দিয়েছিল একজন চিকিৎসককে, দলটির পক্ষ থেকে নির্বাচনে মই প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন মনীষা চক্রবর্তী। এই চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ কেউ বিজয়ী হয়েছেন এবং জনগণ তাদের আপন করে নিয়েছে।
বিএনপি থেকে বিজয়ী যারা
বিএনপির টিকেট সর্বোচ্চ সংখ্যক চিকিৎসক জাতীয় সংসদে যাচ্ছেন। ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন ১০ চিকিৎসক। বিজয়ীরা হলেন– অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন (দিনাজপুর ৬), ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু (গাজীপুর ৩), ডা. আনোয়ারুল হক (নেত্রকোনা ২), ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন (ময়মনসিংহ ৭), ডা. কে এম বাবর (গোপালগঞ্জ ২), ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন (ঢাকা ১৯ সাভার), ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন (হবিগঞ্জ ২), ডা. ইকরামুল বারী টিপু (নওগাঁ ৪), ডা. এম.এ. মুহিত সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) ও ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রানীশংকৈল উপজেলার আংশিক) ডা. আব্দুস সালাম।
জামায়াত থেকে বিজয়ী যারা
জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে সর্বোচ্চ সংখ্যক চিকিৎসককে মনোনয়ন দিলেও বিজয়ী হয়েছেন চারজন। বিজয়ীদের মধ্যে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫), নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের (কুমিল্লা-১১), প্রতিথযশা শিশু হৃদরোগ ও ইনটেনসিভ কেয়ার (আইসিইউ) বিশেষজ্ঞ ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ (যশোর-২ চৌগাছা-ঝিকরগাছা) ও ডা. আব্দুল বারী (রাজশাহী-৪ বাগমারা)। এছাড়া অন্যান্য দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যারা নির্বাচন করেছেন, তাদের কেউ জিততে পারেননি।
বিজয়ী কয়েকজনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন: দিনাজপুর-৬ আসনে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন জাহিদ হোসেন।
ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু: গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও সদর উপজেলার একাংশ) আসনে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম। দলের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত থাকা রফিকুল বিএনপির দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। একাধিক মামলায় হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি বেশ কয়েকবার কারাভোগও করেছেন।
অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক: নেত্রকোনা-২ আসনে বিজয় পেয়েছেন নেত্রকোনা জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক। একজন অর্থোপেডিক ও স্পাইন সার্জন হিসেবে স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখার পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানেও নিজের শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন তিনি।
তিনি নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের প্রধান এবং ময়মনসিংহ কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের কর্মরত ছিলেন।
ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন: ময়মনসিংহ-৭ ত্রিশাল আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন। তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন ভাইস-প্রেসিডেন্ট।
ত্রিশাল উপজেলার কাঁঠাল ইউনিয়নের কৃষিবিদ হাবিবুর রহমানের সন্তান ডা. লিটন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট অন্যতম সদস্য। জাতীয় কবির নামে পূর্ণাঙ্গ এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তার ছিল অগ্রণী ভূমিকা।
ডা. কে এম বাবর: সংসদ নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-২ আসন থেকে বিজয় পেয়েছেন ডা. কে এম বাবর। বরিশাল মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে একাগ্রচিত্ত বাবর শেবাচিমের ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন।
তিনি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন: ঢাকা-১৯ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবু।
তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮৭ সালে এমবিবিএস পাস করেন। ১৯৯১ সালে দশম বিসিএস (স্বাস্থ্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি সরকারি চাকুরি হতে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন তিনি।
ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন: হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ) আসনে বিজয় পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হোসেন (জীবন)। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।
এমবিবিএস অধ্যয়নের সময় তিনি চমেকে ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক, জিএস ও ভিপি ছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় ইনসার্ভিস ট্রেইনি চিকিৎসক পরিষদের কনভেনার, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) পাঁচবার সদস্য ও একবার প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনীতির পাশাপাশি সমাজ সেবায়ও সমান সরব ডা. জীবন। ৪৩ বছর ধরে এলাকায় দরিদ্র মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতা স্যার এফ এইচ আবেদের চাচাতো ভাই।
দলের দুঃসময়ে দীর্ঘদিন রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ডা. জীবন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ১৪টি মামলা হয়, যার ১৩টিতেই তিনি আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন।
ঠাকুরগাঁও-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. আব্দুস সালাম ধানের শীষ প্রতীকে এক লাখ ২১ হাজার ১৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হাকিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন এক লাখ ১৫ হাজার ৭০৭ ভোট।
নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ডা. ইকরামুল বারী টিপু ধানের শীষ প্রতীকে এক লাখ ৩৩ হাজার ৮০১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুর রাকিব পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮১৪ ভোট।
জামায়াতে ইসলামী থেকে বিজয়ীদের পরিচিতি
ডা. শফিকুর রহমান: ঢাকা-১৫ আসনে লড়বেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ১৯৭৪ সালে স্থানীয় বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৭৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে (সিওমেক)। সেখান থেকে ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে তার ছাত্র রাজনীতিতে পথচলা শুরু হয়। জাসদ ছেড়ে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন। শফিকুর রহমান সিওমেক ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং সিলেট শহর শাখার সভাপতি ছিলেন।
১৯৮৪ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সিলেট শহর, জেলা ও মহানগরী আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন তিনি। ২০১৯ সালের ১২ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীর রুকনদের (সদস্য) প্রত্যক্ষ ভোটে আমির নির্বাচিত হন এবং ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ২০২০-২০২২ কার্যকালের জন্য আমির হিসেবে শপথগ্রহণ করেন। ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর জামায়াতের রুকনদের (সদস্য) ভোটে দ্বিতীয়বারের মতো আমির হন এবং ২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর ২০২৩-২০২৫ কার্যকালের জন্য তিনি আমির হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ গ্রহণ করেন এবং সংগঠনের আমির হিসেবে বহাল আছেন।
ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের: কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। তিনি অষ্টম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রথমবারের মতো সদস্য নির্বাচিত হন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) ছাত্র রাজনীতি যুক্ত হওয়ার দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সদস্য হন আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি ঢামেক ছাত্রশিবির ও ঢাকা শহর শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঢামেকে অধ্যয়নের সময় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র কেন্দ্রীয় ইউনিয়নের (ঢামেকসু) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৮৫-৮৬ এবং ১৯৮৬-৮৭ সেশনে কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ: যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ। প্রতিথযশা শিশু হৃদরোগ ও ইনটেনসিভ কেয়ার (আইসিইউ) বিশেষজ্ঞ ডা. ফরিদ যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মরহুম শরীফ হোসেনের ছেলে।
ডা. আব্দুল বারী: রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. আব্দুল বারী। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর নিজের প্রতিষ্ঠিত ভবানীগঞ্জ ক্লিনিকে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন। ডা. আব্দুল বারী তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ এবং সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির বাগমারা গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। -নিউজ ডেস্ক