• Top News

    ইমরান খানের কী অপরাধ ছিল?

      প্রতিনিধি ১৭ এপ্রিল ২০২২ , ৭:৫০:৪০ প্রিন্ট সংস্করণ

    (দিনাজপুর২৪.কম) স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তানের কোনও প্রধানমন্ত্রীই তার মন্ত্রিত্বের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। সেই রেকর্ড ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন ইমরান খান। কিন্তু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল ইসলামাবাদে। তবে ইতিপূর্বে কোনও প্রধানমন্ত্রীকে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়নি। ইমরান খানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যাকে অনাস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়।

    পাকিস্তানের পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতা হারানো ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোলান্ড লু-র হুমকিমূলক বার্তা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। ইমরান বলেছিলেন, তাকে পাকিস্তানের ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য বিদেশি চক্রান্ত হচ্ছে।

    ইমরান আরও বলেছিলেন, যেহেতু তিনি রাশিয়ার সমর্থনে কথা বলেছিলেন, তাই তাকে সরাবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বিদেশি শক্তি। ওয়াশিংটনের পাকিস্তানি দূতকে এই হুমকি দেয়া হয়েছে। তিনি পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের জন্য লড়ছেন বলেও দাবি করেছিলেন ইমরান। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, তারা কোনো হুমকি দেয়নি।

    রবিবার দি ইসলামাবাদ টাইমসে আল্লামা স্যার মোহাম্মদ ইকবালের পুত্রবধূ এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারক নাসিরা জাভেদ ইকবালের একটি কলাম প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি ইমরান খানের ক্ষমতা হারানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।

    নাসিরা জাভেদ ইকবালের কলামটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

    আমি বলছি আপনি কি অপরাধ করেছেন প্রিয় ইমরান। মেয়াদের ১৬ মাস অপেক্ষা না করেই কেন আপনাকে অপসারণ করা হলো, আমি তার উত্তর খুঁজেছি।

    এটা বুঝতে হলে দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে।

    ১.

    পেট্রো ডলার কী। এটি প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং কিং ফয়সালের মধ্যে ১৯৭৪ সালে হওয়া একটি চুক্তি। সৌদি আরবের দায়িত্ব ছিল ওপেকভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে তেল বিক্রিতে রাজি করানো, যাতে তারা অন্য কোন মুদ্রা বা স্বর্ণের বিনিময়ে তেল বিক্রি না করে। আর এই তেল বিক্রির সমস্ত অর্থ রাখা হবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে বা ফেডারেল রিজার্ভে এবং এরপর রয়েছে ওপেক রাষ্ট্রগুলো কীভাবে সেই অর্থ তুলবে তার দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর ফলে মার্কিন ডলারের চাহিদা বাড়ল, কারণ যে কোন দেশ যদি তেল কিনতে চায়, তাদেরকে আগে মার্কিন ডলার কিনতে হবে। এই ব্যবস্থা মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী রাখবে। এর বিনিময়ে সৌদি আরবের মুদ্রা রিয়ালের দাম নির্ধারণ করা হলো, এক ডলার সমান ৩.৭৫ সৌদি রিয়াল। সৌদি আরবের অর্থনীতি ভালো করুক বা মন্দ, এই হার একই থাকবে। এর অবমূল্যায়ন হবে না।

    সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র এটাও নিশ্চিত করল যাতে সৌদ বংশ সবসময় ক্ষমতায় থাকে, সৌদি আরবে কোনো ক্ষমতাবদল হবে না। যুক্তরাষ্ট্র এটা নিশ্চিত করল যেন ওপেকভুক্ত কোন দেশ এই ব্যবস্থা থেকে বের হতে না পারে। ইরাক এবং লিবিয়া সেই চেষ্টা করেছিল, আমরা দেখেছি তাদের পরিণতি।

    ২.

    ১৯৫৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (পরবর্তীতে রাশিয়া) এবং ভারতের মধ্যে হওয়া রুপি-রুবেল বাণিজ্য চুক্তি কী। ভারত থেকে রাশিয়ায় কিছু কিনতে হলে ভারতীয় রুপিতে অর্থ পরিশোধ করা হবে। এর মাধ্যমে ভারতীয় রুপির চাহিদা বাড়ে এবং মুদ্রাটি শক্তিশালী হয়। আবার রাশিয়া থেকে ভারতের কিছু কিনতে হলে রুবেল পরিশোধ করা হবে। ফলে রুবেলেরও চাহিদা বাড়ে এবং মুদ্রাটি শক্তিশালী হয়। এই বাণিজ্য যাতে সহজভাবে চলতে পারে সে জন্য ভারতের একটি ব্যাংক রাশিয়ায় শাখা খুলবে এবং ভারতে শাখা খুলবে রাশিয়ার একটি ব্যাংক। কোনো পক্ষ যাতে প্রতারণার আশ্রয় না নিতে পারে সেটাও নিশ্চিত করা হয়।

    এই ব্যবস্থা হয় সুইফটকে পাশ কাটিয়ে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি, এই চুক্তিটি হয়েছে ১৯৫৩ সালে, ১৯৭৪ সালের পেট্রো ডলার চুক্তির বহু আগে। ইমরান খান হলেন প্রথম পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী,  যিনি ২০১৯ সালে পাকিস্তানি রুপি এবং চীনের ইউয়ান বিনিময়ের একটি চুক্তি করেন। সেমিকন্ডাক্টর,  ট্রান্সফরমার এবং ব্রডকাস্টিং ইকুইপমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে এই চুক্তিটি প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে খুশি হয়নি, তবে যেহেতু এতে তেল অন্তর্ভুক্ত ছিল না, ফলে আর বাধাও দেয়নি। তেল কেনার জন্য ২০২২ সালে রাশিয়ার রবেল-পাকিস্তানি রুপি বিনিময় সংক্রান্ত একটি চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন ইমরান খান। মনে রাখতে হবে, পেট্রো-ডলার চুক্তি হয়েছে ১৯৭৪ সালে। এখন, যুক্তরাষ্ট্র ইমরানের এই উদ্যোগকে কিছুতেই সমর্থন করেনি।

    কারণ অন্য দেশগুলোও যদি পাকিস্তানকে অনুসরণ করে তাহলে মার্কিন ডলার দুর্বল হয়ে পড়বে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যায়ে নেমে আসবে। আর তারা পরাশক্তি থাকবে না। ইমরান খান যদি তার মেয়াদের বাকি ১৬ মাসে এই প্রচেষ্টায় সফল হতেন, এমনকি আগামী নির্বাচনে পরাজয়ের শর্তে হলেও, পাকিস্তান তাহলে দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারত। সে জন্যেই তাকে জরুরি ভিত্তিতে অপসারণ করতে হলো। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর কোন উপায় ছিল না।

    ইমরান খানের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে তিনি এখন সাদ্দাম হোসেন বা গাদ্দাফির সাথে স্বর্গে বসে নেই। যুক্তরাষ্ট্র তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। তবে তিনি যদি এই সুযোগ না নেন তাহলে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন তার ভাগ্যে কী ঘটবে, পাকিস্তানের ভাগ্যেই বা কী ঘটবে। আর দ্বিতীয় মেয়াদে ইমরান খান যদি সফল হন, তাহলে পাকিস্তানি রুপির ক্রমাগত অবমূল্যায়ন বন্ধ হবে (১ ডলার সমান ১৮১ পাকিস্তানি রুপি)।  পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ পরিশোধ শুরু করতে পারবে এবং কনভারশন রেট ক্ষতি পুষিয়ে উঠবে। -অনলাইন ডেস্ক

    মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

    আরও খবর

    Sponsered content