‘এমুন দিনের লাইগা যুদ্ধে গেছলাম না, কইলজার টুকরারে হারাইছলাম না’

0
27

(দিনাজপুর২৪.কম) মুক্তিযুদ্ধে হারিয়েছেন স্বজনদের। আহত মুক্তি-যোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষা করেছেন পরম মমতায়। অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে পৌঁছে দিয়েছেন অস্ত্র ও গোলা। কিন্তু কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর ও নিকলীর হিলচিয়া মুক্তাঞ্চলের সেই নারী যোদ্ধা মনোয়ারা বেগম (৯৪) জীবনযুদ্ধে ভীষণভাবে পরাজিত।

হিলচিয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পেই থাকতেন তখনকার প্রায় মধ্যবয়সী মনোয়ারা বেগম। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, একাত্তরের যুদ্ধের সময় অসম্ভব সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন মনোয়ারা। তাঁর একমাত্র মেয়ে হেলেনা বেগমের স্বামী নিকলীর গুরুই গ্রামের মতি মিয়া স্থানীয় যুদ্ধে শহীদ হন। এর পরই তিনি পাকিস্তানি হানাদারদের ঘায়েল করার ব্রত নেন। ভাই নূর ইসলামসহ চলে যান হিলচিয়া ক্যাম্পে। একাত্তরের ১১ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জ সদরে সম্মুখযুদ্ধে মনোয়ারা বেগমের সেই ভাইটিও প্রাণ হারান। ‘কেমন আছেন আপনি?’ এমন প্রশ্নে হকচকিয়ে ওঠেন মনোয়ারা। অকপটে বলেন, ‘ভালো নেই।’ মনোয়ারা জানান, আগে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে তা বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে তিনি আত্মীয়, প্রতিবেশী আর সুধীজনদের সাহায্যে বেঁচে আছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুক্তিবার্তায় মনোয়ারা বেগমের নাম আছে। মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সনদও আছে তাঁর। নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে তিনি সুপরিচিত। তবে ‘লাল মুক্তিবার্তা’য় নাম ছাপা না হওয়ার যুক্তিতে মনোয়ারা বেগমের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ইয়াকুব মিয়া বলেন, ‘প্রিয়জন হারাবার বেদনা মনোয়ারাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সাহস ও শক্তি জুগিয়েছিল। তিনি এ অঞ্চলের বহু সম্মুখযুদ্ধে নানাভাবে অংশ নিয়েছেন। ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। তাঁর অবদানকে খাটো করে দেখবার সুযোগ নেই।’

কুলিয়ারচরের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আবু সামা ও বাজিতপুরের ‘কিশোর’ মুক্তিযোদ্ধা হাজি জুলমত নূর বলেন, মনোয়ারা বেগম দুঃসাহসী ছিলেন। গ্রেনেড পোঁটলায় লুকিয়ে নিয়ে ভিক্ষুকেরবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। পাকিস্তানি ঘাঁটির সেনার সংখ্যা ও বাংকারগুলোর অবস্থান জেনে নিতেন। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধারা বহু অপারেশনে গেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বরাবরই সম্মান পেয়ে এসেছেন মনোয়ারা বেগম। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনা কর্তৃপক্ষ তাঁর বেদখলে থাকা বাড়ির দখল বুঝিয়ে দিয়েছে। ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি কালের কণ্ঠের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ‘একাত্তরের বিজয়িনী’ হিসেবে তাঁকে ঢাকায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এখন আর অন্যের সহায়তা না নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না মনোয়ারা বেগম। স্মৃতিশক্তিও কিছুটা ঝাপসা হয়ে গেছে। তবে যুদ্ধকালীন স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে তাঁর চোখে-মুখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছিল। এই বীর প্রবীণ নারীর জীবন একাকী কাটছে জরাজীর্ণ একটি ঘরে। ঝড়বাদলে পানির ঝাপটায় শরীর ভিজে যায়। এক পাশে বেড়া ভাঙা থাকায় শিয়াল এসে একদিন কামড়ে দিয়ে গেছে। মনোয়ারাকে তিন বেলা খাবার পাঠান কাঠমিস্ত্রি গৌরাঙ্গ সূত্রধর। গৌরাঙ্গ বলেন, ‘আমার মা নেই। তাঁকে অনেক সম্মান করি। তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। তাই তাঁর খোঁজখবর রাখি।’

মনোয়ারা বেগমের মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বন্ধের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাজিতপুরের ইউএনও এবং পদাধিকারবলে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোছা. মোর্শেদা খাতুন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।’ মনোয়ারা বেগমের দুর্দশায় সহানুভূতি প্রকাশ করে ইউএনও বলেন, তিনি ভাতা বন্ধের বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেবেন।

মনোয়ারা বেগমের এখন আর কোনো স্বপ্ন নেই। আর কয় দিনই বা বাঁচবেন! অপরের দয়া-দাক্ষিণ্য নিয়ে আর বেশিদিন বাঁচতে চান না। তবে মৃত্যুর আগে তিনি হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে চান। চান বিতর্কের বাইরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নামটি উঠুক। আক্ষেপ নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘এমুন দিনের লাইগা যুদ্ধে গেছলাম না। কইলজার টুকরারে হারাইছলাম না। অনলাইন ডেস্ক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here