প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
হজের মাসে ওমরা: বিধান ও প্রচলিত বিভ্রান্তি
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম, ডেস্ক রিপোর্ট ||
হজের মাসে ওমরা করলে কী হয়? এ প্রশ্নকে ঘিরে আমাদের সমাজে নানা কথা প্রচলিত। কেউ বলেন, ‘হজের মাসে ওমরা করলে পরের বছর হজ করা ফরজ হয়ে যায়’, আবার কেউ মনে করেন ‘এ সময় ওমরা করা ঠিক নয়’ কিংবা ‘হজের আগে ওমরা করলে অমঙ্গল হয়’। অথচ ইসলামের মৌলিক দলিল- কোরআন ও সহিহ হাদিসে এসব বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। অজ্ঞতা ও লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া কুসংস্কারই এসব ধারণার জন্ম দিয়েছে।হজের মাস কোনগুলো?আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হজের মাসগুলো সুনির্দিষ্ট।’ (সুরা বাকারা: ১৯৭) ফকিহগণের ঐকমত্য অনুযায়ী এই তিনটি মাসকে ‘আশহুরুল হজ’ বা হজের মাস বলা হয়-• শাওয়াল• জিলকদ• জিলহজ (প্রথম দশ দিন)এই মাসগুলোতে ওমরা পালন করা শরিয়তসম্মত এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়।হজের মাসে ওমরার বিধান ও ফজিলত১. রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহরাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর জীবনের চারটি ওমরার প্রতিটিই হজের মাসে- বিশেষত জিলকদ মাসে পালন করেছিলেন। তাঁর ‘ওমরাতুল কাজা’ এবং ‘জিরানা’ থেকে আদায়কৃত ওমরা উভয়ই হজের মাসের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। সুতরাং হজের মাসে ওমরা করা প্রিয়নবীর সুন্নাহর অনুসরণ।২. হজে তামাত্তুর সুযোগকেউ যদি হজের মাসে ওমরা সম্পন্ন করে ইহরাম খুলে পুনরায় ৮ জিলহজ হজের ইহরাম বাঁধেন, তাহলে তা ‘হজে তামাত্তু’ হিসেবে গণ্য হয়। কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত এই পদ্ধতিটিকে অধিকাংশ আলেম তিন প্রকার হজের মধ্যে সর্বোত্তম মনে করেন। তামাত্তু হজে কোরবানি (দম) দেওয়া ওয়াজিব।প্রসঙ্গত, রমজান মাসে ওমরার এক বিশেষ ফজিলত হাদিসে বর্ণিত- ‘রমজান মাসে একটি ওমরা সওয়াবের বিচারে হজের সমতুল্য।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) হজের মাসের ওমরাও ফজিলতপূর্ণ, তবে এই তুলনাটি বিশেষভাবে রমজানের জন্য প্রযোজ্য। জাহেলি যুগের প্রথা ও ইসলামের সংশোধনইসলামপূর্ব জাহেলি যুগে আরবরা বিশ্বাস করত- হজের মাসে ওমরা করা মহাপাপ। এটি ছিল নিছক কুসংস্কার। ইসলাম এসে এই অজ্ঞতার প্রথা সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে জিলকদ মাসে ওমরা করে প্রমাণ করেছেন যে বছরের যেকোনো সময়, বিশেষত হজের মাসেও ওমরা করা অত্যন্ত পুণ্যময় কাজ।প্রচলিত ভুল ধারণানিচে সমাজে ছড়িয়ে থাকা কিছু বহুল প্রচলিত কিন্তু শরিয়তে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ধারণা তুলে ধরা হলো-ওমরার বিধান নিয়ে ভুল ধারণাভুল ধারণা ১: ‘হজের মাসে ওমরা করলে পরের বছর হজ ফরজ হয়ে যায়’এটি সম্পূর্ণ ভুল। হজ ফরজ হওয়ার শর্ত হলো আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা। যদি কারো ওপর আগে থেকেই হজ ফরজ না থাকে, তাহলে শুধু ওমরা করার কারণে ওই বছরই হজ বাধ্যতামূলক হয়ে যায় না।ভুল ধারণা ২: ‘হজের মাসে ওমরা করে বাড়ি ফিরলে জরিমানা জরুরি’এটিও ভিত্তিহীন। ওমরা শেষ করে যেকেউ স্বদেশে ফিরতে পারেন। এতে কোনো ‘দম’ বা জরিমানা ওয়াজিব হবে না। তামাত্তু হজ করলে দম দিতে হয়- কিন্তু কেবল ওমরা করে ফিরলে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। ভুল ধারণা ৩: ‘জিলহজ মাসে ওমরা নিষিদ্ধ বা মাকরুহ’কেউ কেউ মনে করেন জিলহজের প্রথম দশ দিনে ওমরা করা নিষিদ্ধ। এটি সঠিক নয়। জিলহজ মাসেও ওমরা করা জায়েজ। তবে হজের কাজে ব্যস্ততার কারণে এ সময় ওমরায় কম মনোযোগ দেওয়া হয়।ভুল ধারণা ৪: ‘হজের আগে ওমরা করলে হজ কবুল হয় না’ওমরা ও হজ দুটি স্বতন্ত্র ইবাদত। একটি আদায় করলে অন্যটির কবুলিয়তে কোনো প্রভাব পড়ে না। বরং হজে তামাত্তুতে আগে ওমরা করাটাই নিয়ম।ওমরার আমল নিয়ে ভুল ধারণাভুল ধারণা ৫: ‘কাবার গিলাফ বা দেয়াল স্পর্শে বরকত মেলে’কাবার গিলাফ ধরা বা দেয়াল স্পর্শ করে বরকত অর্জনের ধারণা শরিয়তের দলিল দ্বারা সমর্থিত নয়। শুধুমাত্র হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) স্পর্শ বা চুম্বন সুন্নাহ। অন্য স্থানে এ ধরনের আমল সুন্নাহর বাইরে এবং আলেমগণ এটিকে অনুমোদন করেন না।ভুল ধারণা ৬: ‘নির্দিষ্ট স্থানে দোয়া করলে সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়’মুলতাযাম, রুকনে ইয়ামানি বা হাতিমে দোয়া করা উত্তম বলে আলেমগণ উল্লেখ করেছেন- তবে ‘এখানে করলেই কবুল হবে’ এমন নিশ্চিত বিশ্বাস ভুল আকিদার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দোয়া কবুল হওয়া একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। ওমরার মূল আমল ও পরামর্শওমরার চার রুকন-ইহরাম বাঁধা ও নিয়ত করাবায়তুল্লাহর তাওয়াফ (সাত চক্কর)সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাঈ করামাথার চুল কাটা বা ছাঁটা (হলক বা তাকসির) বিশেষ পরামর্শওমরার আগে নির্ভরযোগ্য আলেম বা বিশ্বস্ত ইসলামিক বই থেকে মাসায়েল জেনে নিনলোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদার জন্য নয়, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে ওমরা পালন করুনমক্কা-মদিনায় কবরে সেজদা বা পাথর ছুঁয়ে বরকত খোঁজার মতো কাজ থেকে বিরত থাকুননিয়ত অন্তরের বিষয়- উচ্চস্বরে বিস্তারিত নিয়ত পড়ার প্রচলন শরিয়তের মূল নিয়মের মধ্যে পড়ে নাহজের মাসে ওমরা পালন করা সম্পূর্ণ বৈধ, সুন্নাহসম্মত এবং অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। ইসলামে ইবাদতের বিধান আবেগ বা লোকমুখে প্রচলিত কথা থেকে নেওয়া হয় না; বরং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর দলিল থেকে। কোনো আমল সম্পর্কে অদ্ভুত ভয় বা অমূলক বাধ্যবাধকতা শুনলে তা যাচাই করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। দ্বীনের নামে কুসংস্কার ছড়ানো যেমন ক্ষতিকর, তেমনি এটি মানুষকে সহজ ইবাদত থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়।তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ১৯৭; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; শারহুল মুহাজজাব; আল-মুগনি; রদ্দুল মুহতার; দারুল ইফতা-সৌদি আরব ও বাংলাদেশ ইফা
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডট কম