প্রিন্ট এর তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
আকস্মিক বন্যায় নেপালে প্রাণহানি বেড়ে ৬৩৩, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম, আন্তর্জাতিক ডেস্ক ||
হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালে চতুর্থ দিনের মতো জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যদিও সেখানে শুরু হয়েছে বৃষ্টিপাত, যা নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি করেছে।এখন পর্যন্ত এই দৈব-দুর্বিপাকে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩৩ জনে। এই সংখ্যা ক্রমান্বয়ে আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।ভয়াবহ এই বন্যায় দুই দেশ মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার জন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নিখোঁজদের মধ্যে সাতশ’ এর বেশি বিদেশি পর্যটক রয়েছেন।বিবিসি সূত্রে জানা গেছে, উত্তর নেপাল জুড়ে আবারও শুরু হয়েছে ভারী বৃষ্টিপাত এবং জরুরি উদ্ধারকারী দলগুলো সতর্ক করে বলছে যে, এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছানো দুষ্কর হয়ে উঠেছে।নেপালে বিপর্যয়ের মাঝে টিকে থাকা একটি বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা / ছবি: রয়টার্সপ্রধান প্রধান সড়ক ও সেতুগুলো ভেঙে যাওয়ায় দুর্যোগ কবলিত এলাকায় পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। সেই সঙ্গে ওই এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত আরো সমস্যা তৈরি করেছে। বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টারগুলো মুহুর্মুহু যাতায়াত করছে।ত্রিশূলিতে, সেনাবাহিনী আরও বন্যা হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করছে।এদিকে ওই বিপর্যয়ের পর তিব্বত অংশের ধ্বংসযজ্ঞের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেছে চীনের কর্তৃপক্ষ। সেসব ছবিতে ওই এলাকায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে।চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত চীনের তিব্বত অংশে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন।নেপালের উদ্ধারকর্মীরা বিপর্যস্ত এলাকা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।প্রতিবেশী ভারতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল থেকে বয়ে আসা নদীগুলো থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো এই বন্যার শিকার ব্যক্তিদের বলেই ধারণা করা হচ্ছে।এদিকে বুধবারের আকস্মিক বন্যার ফলে সৃষ্টি হওয়া একটি হৃদ থেকে আবার এরকম বন্যার তৈরি হতে পারে, এই আশঙ্কায় উদ্ধার কাজ স্থগিত করেছে চীন। উদ্ধার কার্যক্রম চলছে, তবে চীনের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে দিয়েছে যে, সামনের কিছুদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে, যা উদ্ধার কাজে বাধার পাশাপাশি ভূমিধস ঘটাতে পারে।বন্যায় ধ্বংসযজ্ঞের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় দুইজন বাসিন্দা / ছবি: রয়টার্সনেপালের এই আকস্মিক বন্যার পর থেকে সেই দেশের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ধারাবাহিক তথ্যের প্রবাহ রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু পরস্পরবিরোধী তথ্য ও রিপোর্ট পাওয়া গেছে।আকস্মিক বন্যার পর হতাহত ও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বহুবার হালনাগাদ (আপডেট) করা হয়েছে এবং নেপাল পুলিশ ও দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থার তরফ থেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান রিপোর্ট করা হয়েছে।জীবিতদের উদ্ধার, নিখোঁজদের সন্ধান এবং মরদেহ উদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকায় সংখ্যাগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। জরুরি উদ্ধার অভিযানের দ্রুতগতির কারণে কিছু পরিসংখ্যান অমিল হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক।বিবিসি সংবাদদাতারা জানিয়েছেন, এ ধরনের বড় বিপর্যয় বা আকস্মিক বন্যার পর সরকারি পরিসংখ্যান সবসময় মেলে না।অন্যদিকে তিব্বতের প্রকৃত পরিস্থিতি জানা বেশ কঠিন— ১৯৫০-এর দশকে চীন এটি দখল করে নেয় এবং এটি চীন দ্বারা শাসিত অন্যতম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি অঞ্চল। সংবাদমাধ্যমের জন্য সেখানে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন, তাই তথ্যের জন্য আমাদের চীনা জাতীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।নেপালের বিপর্যস্ত এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রমে সামরিক-বেসামরিক উদ্ধারকর্মীরা / ছবি: গেটি ইমেজেসটানেলে আটকে থাকাদের উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টানেপালের একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে একটি সুড়ঙ্গে অনেক মানুষ আটকে রয়েছেন, যাদের উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজের তালিকায় বিপুলসংখ্যক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্প থাকা এলাকাগুলোর ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎকর্মীর নাম নতুন করে যুক্ত করেছে।রসুয়ায় ত্রিশূলি-৩ ‘এ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে শনিবার সকাল থেকে সুড়ঙ্গের মুখ খোলার কাজ জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়।খবর অনুযায়ী, গত দুই দিন ধরে এই উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।সচিবালয় জানিয়েছে, সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ দল এবং নেপাল পুলিশের একটি যৌথ দল স্তূপীকৃত ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খোলার কাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছে।এদিকে, ত্রাণ সহায়তায় এগিয়ে আসা একটি ভারতীয় দলও সম্প্রতি ত্রিশূলিতে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।সুড়ঙ্গে ঠিক কতজন আটকে রয়েছে, জানা যায়নি। কারণ আকস্মিক বন্যার পর থেকেই তাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে।স্যাটেলাইট ছবিতে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত ক্রসিং পয়েন্ট, যা বন্যায় ধুয়েমুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে / ছবি: ভ্যান্টরস্যাটেলাইট ছবিতে ধ্বংসের চিত্রশত শত মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর নেপাল-তিব্বত সীমান্তের শহর ও গ্রামগুলোর বন্যা ও কাদা-ধসের আগের এবং পরের আকাশ থেকে তোলা (স্যাটেলাইট) ছবি বিপর্যয় ও ধ্বংসলীলার ভয়াবহতা ফুটিয়ে তুলেছে।গত মাসে তোলা এই কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিগুলোতে নেপালের তিমুরে এলাকার নদীর তীর ঘেঁষে রঙিন ভবনগুলো দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে কেবল কয়েকটি ভবন টিকে রয়েছে এবং পুরো এলাকাটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে কাদা, পানি ও পাথরের স্তূপে তলিয়ে গেছে।ত্রিশূলি নদীর তীরে অবস্থিত রসুয়াগড়ী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি কয়েক দিন আগেও একটি সমৃদ্ধ শিল্প অঞ্চল ছিল। কিন্তু এখন আকাশ থেকে তোলা ছবিতে সেটির কোনো চিহ্নই প্রায় অবশিষ্ট নেই।নেপালের বন্যায় ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে / ছবি: রয়টার্সচিতওয়ানে সংগৃহীত মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা ‘কঠিন’চিতওয়ানের স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, গত বুধবারের ভয়াবহ বন্যায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে চিতওয়ান থেকে এ পর্যন্ত সংগৃহীত ২৩৩টি মরদেহের মধ্যে মাত্র ৪টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।শনিবার সকালে চিতওয়ান জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে জারি করা এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে রাখা হয়েছে।বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও নদীতীর থেকে সংগৃহীত মরদেহ ও অবশিষ্টাংশ পচে গলে গেছে এবং সেগুলো আর চেনার উপায় নেই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্রুত ব্যবস্থাপনার আওতায় না আনা এই গলিত মরদেহগুলো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা থেকে সংক্রমণ বা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।’‘মরদেহগুলোর আরও পচন রোধ করতে, সেগুলোকে শ্রদ্ধাপূর্ণ, নিরাপদ ও আইনি উপায়ে দাফন বা সৎকার করতে এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এক বাধ্যবাধকতামূলক বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। চিতওয়ান জেলা নিরাপত্তা কমিটির ২০৮৩.০৫.১৩ তারিখের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘অশনাক্ত ও দাবিহীন মরদেহ ব্যবস্থাপনা (প্রথম সংশোধনী) নির্দেশিকা, ২০৮৩’-এর ধারা মেনে সব মরদেহ ভূগর্ভস্থ বা মাটির নিচে দাফন/ব্যবস্থাপনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’সিদ্ধান্ত অনুসারে, প্রতিটি মরদেহের কোড নম্বর অনুযায়ী ডিএনএ (DNA) নমুনা সংগ্রহ করে রেকর্ড রাখা হবে। এরপর শনিবার থেকে ভারতপুর মহানগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডের দেবঘাটের একটি উন্মুক্ত স্থানে এসব মরদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা ভূগর্ভস্থ দাফন ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে তথ্য সরবরাহের অনুরোধ করা হয়েছে।তিব্বতের উদ্ধারকাজের কিছু ছবি প্রকাশ করেছে চীন / ছবি: গেটি ইমেজেসএত পর্যটক কেন ছিলেন ওই এলাকায়?নেপাল ও তিব্বতে নিখোঁজ অনেক পর্যটক তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে ভ্রমণ করছিলেন। এই অঞ্চলটি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি পবিত্র ও জনপ্রিয় স্থান, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পবিত্র স্থানসমূহ পরিদর্শনের জন্য যান।আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিদেশি দর্শনার্থীদের মধ্যে সর্ববৃহৎ দলটি ভারতীয় নাগরিকদের, যাদের অনেকেই তীর্থযাত্রায় ছিলেন। অনেক ভারতীয় পর্যটক নেপাল হয়ে তিব্বতের কৈলাশ পর্বতে যান। ৬,৪০০ মিটার (২১,০০০ ফুট) উঁচু এই শৃঙ্গটি হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৈলাশ পর্বতে আসা দীপক এবং মধু আহুজা সেই বহু তীর্থযাত্রীদের মধ্যে রয়েছেন যারা নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের মেয়েরা বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমরা তাদের খুব ভালোবাসি এবং কেবল চাই তারা বাড়ি ফিরে আসুক।’নেপাল কেবল তীর্থযাত্রীদের জন্যই প্রিয় গন্তব্য নয়, এটি বিশ্বজুড়ে ট্রেকার বা পর্বতারোহীদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য।বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় এলাকা ‘রাসুয়া’ হাইকিংয়ের জন্য বেশ জনপ্রিয়। যদিও আগস্ট মাস পর্যটনের মূল মৌসুম নয়, তবে কর্তৃপক্ষের ধারণা বন্যা আঘাত হানার সময় সেখানে কিছু পর্বতারোহী উপস্থিত ছিলেন।সূত্র: বিবিসি বাংলা, এপি
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডট কম