প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬
কমছে বিদেশি অনুদান, বড় সংকটে দেশের ২২০০ এনজিও
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম , নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলো বড় ধরনের অর্থায়ন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং যারা প্রায় পুরোপুরি বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুই হাজার ২০০টি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থায়নের সংকট দীর্ঘ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি-স্যানিটেশন, জলবায়ু ও অন্যান্য সামাজিক সেবা কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে।মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিদেশ-নির্ভরতা পেরিয়ে: বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল।গবেষণায় এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপ, জাতীয় পরামর্শ সভা, উত্তরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি এনজিও নিয়ে দলীয় আলোচনা এবং বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা দ্রুত কমছে। ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত মূল্যে ২৩ শতাংশ কমেছে। এক বছরে সহায়তা কমার হিসাবে এটি সবচেয়ে বড় পতন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের আগামী কয়েক বছরের সহায়তা বাজেট কমানোর কারণে এই সংকটকে সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন গবেষকরা।বাংলাদেশে বিদেশি সহায়তা কমার পুরো প্রভাব এখনো দেখা যায়নি। এর কারণ আগে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর অর্থ এখনো ছাড় হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব পুরনো প্রকল্পে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সংখ্যা ইতোমধ্যে কমে গেছে।২০২১-২২ অর্থবছরে এনজিও খাতে দুই হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা নেমে এসেছে এক হাজার ৬৫৪টিতে। ফলে পুরোনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হয়ে গেলে এনজিওগুলোর অর্থায়ন সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।৪৬টি এনজিওর ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বিদেশি অনুদাননির্ভর সেবাধর্মী এনজিওগুলোর বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকা এনজিওগুলোর বাজেট কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। অর্থাৎ যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় বা ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক অর্থের উৎস রয়েছে, তারা তুলনামূলকভাবে সংকট সামাল দিতে পারছে। বিপরীতে অনুদাননির্ভর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর বিকল্প অর্থের উৎস সীমিত।অর্থের সংকট দেখা দিলে মাঠপর্যায়ের সামাজিক সেবায় এর প্রভাব পড়তে পারে। স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি কমিয়ে দিতে বা কর্মীসংখ্যা কমাতে বাধ্য হতে পারে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কার্যক্রমে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এনজিওগুলোর যোগাযোগ ও সেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় চারটি বিকল্প অর্থায়নের পথের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যবহার, সামাজিক ব্যবসা এবং নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা।গবেষকদের মতে, এসব বিকল্পের মধ্যে বড় পরিসরে অর্থ জোগানের সক্ষমতা মূলত সরকারেরই রয়েছে। বিদেশি অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশের সমান। ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয়বিধিতে সরকারি সেবা প্রদানে এনজিওকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হলেও বাস্তবে এ সুযোগ খুব কম ব্যবহার করা হচ্ছে।গবেষণায় সরকার ও এনজিওর যৌথভাবে সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের মতে, এনজিওগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছানোর সক্ষমতা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জ্ঞান এবং সেবা গ্রহণে মানুষকে সম্পৃক্ত করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে কিছু সেবা সরকার একা দেওয়ার পরিবর্তে এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে দিলে ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সেবার কার্যকারিতাও বাড়তে পারে।বিদেশি অনুদানের বিকল্প হিসেবে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখা হলেও এখানেও সংকোচন দেখা দিয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যয় ২০২৫ সালে ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। ফলে বিদেশি অনুদানের বড় ঘাটতি এককভাবে এই অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।সামাজিক ব্যবসা ও নতুন আর্থিক ব্যবস্থাও বিকল্প হতে পারে। তবে ছোট এনজিওগুলোর ক্ষেত্রে বন্ড বা ফলভিত্তিক অর্থায়নের মতো ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় জামানত, ঋণপোর্টফোলিও ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।এ ছাড়া সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ও সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে একটি নীতিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।মন্ত্রী বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এনজিওগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের অর্থায়নের বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।গবেষকদের মতে, বিদেশি অনুদান কমার প্রভাব বাংলাদেশে এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদন কমে যাওয়ার প্রবণতা সামনে বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পুরনো প্রকল্পের অর্থ শেষ হওয়ার পর ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি প্রকল্প, দেশীয় অর্থায়ন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ও সামাজিক ব্যবসাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগিয়ে এনজিও খাতে নতুন অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা। _ডেস্ক রিপোর্ট
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্ব সংরক্ষিত দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডট কম