(দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর ডটকম) বেড়েছে শীতের তীব্রতা। ঘন কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। কনকনে শীত ও কুয়াশার দাপটে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। রোদের দেখা নেই। তাই শীত আরও জেঁকে বসেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে ঠান্ডার তীব্রতা আরও বেশি। সেই সঙ্গে বইছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। কষ্টে পড়েছেন শ্রমজীবী ও নিু আয়ের মানুষরা। কাজে যেতে না পারায় দুমুঠো খাবার জোগাড় তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। বেড়েছে সর্দি-কাশি-শ্বাসকষ্টসহ ঠান্ডাজনিত রোগবালাই। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ভোগান্তির শেষ নেই। এদিকে সামান্য দূরত্বেও দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় কার্যত প্রায় অচল হয়ে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। ঢাকায় বিমান নামতে না পেরে যাচ্ছে বিকল্প বিমানবন্দরে। দুর্ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন নৌরুটে বন্ধ রয়েছে নৌচলাচল। আর বিলম্বিত শিডিউলে চলছে ট্রেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। আরও অন্তত চার দিন ঘন কুয়াশার দাপট থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সময়ে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। যশোরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের সর্বনিু তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। শুক্রবার ভোরে যশোরে তাপমাত্রা ছিল ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবারও যশোরে দেশের সর্বনিু ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সবমিলিয়ে এই মৌসুমে চার দিন সর্বনিু তাপমাত্রা এই জেলায় রেকর্ড করা হয়েছে। টানা এই শীতের দাপটে শহর-গ্রামে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও প্রান্তিক মানুষ দুর্বিষহ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আবহাওয়াবিদ শাহনাজ সুলতানা বলেন, আগামী ১২০ ঘণ্টা সারা দেশে কুয়াশা ও শীতের প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের অনেক জায়গায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কোথাও কোথাও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
প্রতিকূল আবহাওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব রুটের বেশির ভাগ ফ্লাইট এক থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে আসে। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রী ও স্বজনরা তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন। এর আগেও ঘন কুয়াশার কারণে বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত চারটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ করতে পারেনি।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দুবাই ও দোহা থেকে আসা দুটি ফ্লাইট, মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি এবং তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে আসা টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট কলকাতায় ডাইভার্ট করা হয়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কন্ট্রোল রুম থেকে জানা যায়, কিছু ফ্লাইটের বিলম্ব হয়েছে, তবে সংখ্যা খুব বেশি নয়।
কিছু রুটে ফেরিসহ নৌযান চলাচল বন্ধ : কুয়াশার তীব্রতায় দৃশ্যমানতা মারাÍকভাবে কমে যাওয়ায় শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌরুটে ফেরি চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে বিআইডব্লিউটিসি ঘাট কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার পর থেকে এ রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় উভয় ঘাটে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকসহ শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। একই কারণে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটেও বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৩০ মিনিট থেকে পদ্মা নদীর অববাহিকায় ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
ঘন কুয়াশার কারণে শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌরুটে প্রায় ১০ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় উভয় ঘাটে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকসহ শতাধিক যানবাহন আটকা পড়ে। পরে শুক্রবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে কুয়াশার ঘনত্ব কিছুটা কমলে ফেরি চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। একই পরিস্থিতি দেখা যায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটেও। প্রায় ৮ ঘণ্টা ধরে ফেরিসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহণগুলো চরম বিপাকে পড়ে।
এ সময় আটকে পড়া যাত্রী শরিফুল ইসলাম বলেন, ভোররাত থেকে ঘাটে অপেক্ষা করছি। কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ থাকায় কোথাও যেতে পারছি না। গাড়িতে বসেই সময় কাটছে। শীতের মধ্যে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
এদিকে দেশের নদী অববাহিকায় ঘন কুয়াশার কারণে নৌযান চলাচল নিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। শুক্রবার সকালে দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরের জন্য দেওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে দেশের নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা ২০০ মিটার বা কোথাও কোথাও এর চেয়ে কম হতে পারে। এসব এলাকার নৌযানগুলোকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত রোববার সন্ধ্যায় ঘন কুয়াশার কারণে সারা দেশে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছিল বিআইডব্লিউটিএ। একই দিনে বরিশালে ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকাগামী পাঁচটি লঞ্চের যাত্রা বাতিল করা হয়। বরিশাল নদীবন্দর থেকে সরাসরি ঢাকাগামী চারটি এবং ভায়া পথে চলাচলকারী একটি লঞ্চের যাত্রী নামিয়ে যাত্রা বাতিলের নির্দেশ দেয় বিআইডব্লিউটিএ। তীব্র কুয়াশার কারণে দুই দিন বন্ধ থাকার পর ঢাকাগামী পাঁচটি বিলাসবহুল লঞ্চ বরিশাল নদীবন্দর ত্যাগ করে মঙ্গলবার রাতে।
ব্যাহত ট্রেন চলাচল : একই দৃশ্য দেখা যায় রেল চলাচলেও। কুয়াশার দাপটে ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন চলাচল ব্যবস্থা। নিয়মিতই বিলম্বে ছাড়ছে বিভিন্ন ট্রেন। কয়েক দিন ধরে প্রায় সব ট্রেনই নির্ধারিত সময়সূচি মানতে পারছে না। ঢাকা থেকে যে ট্রেনটি দেরিতে ছেড়ে যাচ্ছে, সেটি ফেরার পথেও বিলম্বে আসছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। এদিকে কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কম থাকায় লাইনচ্যুত হয় ভৈরব থেকে ঢাকামুখী ছেড়ে আসা নরসিংদী কমিউটার ট্রেন। শুক্রবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর বিমানবন্দর ও খিলক্ষেতের মাঝামাঝি কাওলায় ট্রেনটির দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহী ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচলের সময়সূচির বিপর্যয় ঘটেছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, কয়েকদিন ধরে কুয়াশার কারণে রেলওয়ের বিভিন্ন সেকশনে গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে।
কমলাপুর স্টেশন সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করছেন। কুয়াশায় বিভিন্ন ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২-৩ ঘণ্টা বিলম্বে কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছাচ্ছে।
স্টেশন সূত্রে জানা যায়, কুয়াশা ও লাইনচ্যুতির কারণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্তত ১৭টি ট্রেন বিলম্বে চলাচল করেছে। মহানগর এক্সপ্রেস প্রায় পৌনে ৪ ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে গেছে। এগারসিন্ধুর, মোহনগঞ্জ, অগ্নিবীণা, উপকূল, সিল্কসিটি, জয়ন্তিকা ১ থেকে ৩ ঘণ্টা বিলম্বে চলেছে। রেলওয়ে কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সেকশনে কুয়াশার কারণে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতি নিয়েও ট্রেন চালাতে হচ্ছে। ফলে শিডিউল মেনে ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে রাতে চলা ট্রেনগুলো শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ছে।
এদিকে প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কুড়িগ্রামে সকাল ৬টায় ছিল ১০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া ভোরে যশোরে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। -নিউজ ডেস্ক



















