বন্ধ হচ্ছে মানহীন মেডিকেল, সনদ পাচ্ছে আরও ৯টি
দেশের মেডিকেল শিক্ষার মানোন্নয়ন ও চিকিৎসা শিক্ষায় গুণগত মান নিশ্চিত করতে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মানহীন মেডিকেল কলেজগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করার পাশাপাশি মানসম্মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সনদ দেওয়া হবে।ইতোমধ্যে পাঁচটি মেডিকেল কলেজ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের আনুষ্ঠানিক সনদ পেয়েছে। পাশাপাশি আরও ৯টি মেডিকেল কলেজ সনদ পাওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজের জন্য এই সনদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হবে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিতসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।বিএমইএসি সূত্রে জানা গেছে, নয়টি মেডিকেল কলেজের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে কয়েকটি মিটিং করেছে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল। আর নয়টি মেডিকেল কলেজ অফিসিয়ালভাবে সনদ দিতে অল্পকিছু দিন সময় লাগবে। এর মধ্যে ঘোষণা চূড়ান্ত করতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন বিএমইএসি কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাই শেষে প্রজ্ঞাপন আকারে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেবে বিএমইএসি।যেসব মেডিকেল কলেজ সনদ পেতে যাচ্ছে এর মধ্যে রয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, বগুড়ার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লার ময়নামতি মেডিকেল কলেজ। বাকি দুটি মেডিকেল কলেজের নাম জানা যায়নি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএমইএসির এক কর্মকর্তা বলেন, সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা নয়টি মেডিকেল আবেদন করেছিল। তাদের মান যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তাদের সুপারিশও দেওয়া হয়েছে, সেই অনুযায়ী তারা মান উন্নয়ন করছে। শিগগিরই তাদের সনদ দেওয়া হবে।ওই কর্মকর্তা বলেন, বিএমইএসির নির্ধারিত নীতি ও প্রক্রিয়া অনুযায়ী সব মানদণ্ড পূরণ হলে সনদ দেওয়া হবে। এছাড়া কোনো মেডিকেল সনদ দেওয়া হবে না। আর বাংলাদেশে এমবিবিএসের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে বিএমইএসির সনদ লাগবে। এই সনদ ছাড়া কেউ মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করতে পারবে না।জানতে চাইলে বিএমইএসির রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, নয়টি মেডিকেল কলেজের সনদ প্রসেসিংয়ের মধ্যে আছে। আমরা মেডিকেল কলেজগুলোকে যেসব নির্দেশনা দিয়েছি, সেগুলো তারা পূরণ করছে এবং তাদের মান উন্নয়ন করেছে। যারাই আবেদন করবে এবং মান উন্নয়ন করবে; তাদের মেডিকেল কলেজে আমরা ভিজিট করবো। পরিদর্শনে মান, মেডিকেল পরিবেশ এবং যাবতীয় সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা সনদ দিয়ে দেব।হুমায়ুন কবির তালুকদার বলেন, পরিদর্শনে পরিদর্শকরা লাইব্রেরি, ল্যাব, ক্লিনিক্যাল টিচিং, অবকাঠামো, পাবলিকেশনসহ ১১টি বিষয় দেখে থাকেন। তারা রিপোর্ট করেন এবং সবকিছু যাচাই-বাছাই করে রিপোর্ট ভালো মনে হলে সনদ দেওয়া হয়। মানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হয় না। মেডিকেল কলেজগুলোকে ঘাটতি পূরণ করতেই হবে। মানে কোনো ছাড় দেওয়া হলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে প্রভাব পড়বে এবং অদক্ষ চিকিৎসকরা সেবা দেবে; তাতে দেশের মানুষেরই ক্ষতি হবে। সুতরাং সবাইকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে।বিএমইএসির রেজিস্ট্রার বলেন, মেডিকেলে কলেজগুলোকে যেভাবে তৈরি হতে হয়, প্রত্যেকটা মেডিকেলে সব প্রমাণাদি পাঠানো হয়েছে। ৮০টি মেডিকেল কলেজ থেকে ফ্যাকাল্টি মেম্বার নিয়ে এসে ৫৬২ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমরা ২০২৫ সালের আগস্টে বলেছি, নভেম্বর থেকে প্রত্যেকটা মেডিকেল কলেজ আবেদন করতে পারবে। সব মেডিকেল কলেজকে পর্যায়ক্রমে আবেদন করতে হবে এবং সনদ নিতে হবে। আমরা তাদের অনলাইনে এবং অফলাইনে সহযোগিতা করছি, যাতে তারা মান উন্নয়ন করে আবেদনটা করে। প্রত্যেকটা সাবজেক্ট ধরে ধরে আমরা সুপারিশ দিয়েছি। তাদের কোয়ালিটি এবং কোয়ানটিটি বাড়াতে হবে।জানা গেছে, দেশে মোট ১১২টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এরমধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৭টি, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ৬৮টি এবং আর্মি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ৭টি। ১১২টি মেডিকেল কলেজের মধ্যে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের সনদ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছে মাত্র ১৪টি মেডিকেল কলেজ। তবে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না করায় বেসরকারি মেডিকেলের মধ্যে রংপুরে নর্দার্ন মেডিকেল, রাজশাহীর শাহ মাখদুম, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কেয়ার মেডিকেল ও সাভারের নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজসহ মোট ৬ মেডিকেল কলেজে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি মেডিকেল কলেজের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। দেশের শিক্ষার্থী ছাড়াও এসব মেডিকেলে পড়াশোনা করছেন বিদেশি অনেক শিক্ষার্থী। বেসরকারি মেডিকেলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই বিদেশি শিক্ষার্থী। তারা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ঠিক রাখতে অবদান রাখেন এবং দেশের মেডিকেল শিক্ষার সুনাম বিদেশের মাটিতে ছড়িয়ে দেন। তাই বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোও যাতে যথাযথ মান রাখে, এজন্য সরকারের জোরালো তৎপরতা জরুরি।ইতোমধ্যে মোট পাঁচটি মেডিকেল কলেজকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিএমইএসি। মেডিকেলগুলো হলো- ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, ঢাকার আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ ও সিলেটের নর্থ ইস্ট মেডিকেল কলেজ। আর বাকি মেডিকেল কলেজকে পর্যায়ক্রমে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের সনদ নিতে হবে। সেইসঙ্গে নিজেদের দুর্বলতা কাটাতে হবে ও মেডিকেল শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হবে।প্রসঙ্গত, চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিশ্বমানের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে ২০২৩ সালে বিএমইএসি গঠন করে সরকার। সরকারি এই সংস্থাটির কাজ দেশের মেডিকেল কলেজগুলোর এমবিবিএস কোর্সে মেডিকেল শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা। এই সংস্থাটি বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন আইন, ২০২৩ অনুযায়ী গঠিত হয়েছে।
৩১ মিনিট আগে