স্থানীয় নির্বাচন: স্থায়ী ভোটকেন্দ্রে নজর ইসির
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটগ্রহণকে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও সহজ করতে এবার অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রের পরিবর্তে স্থায়ী ভোটকেন্দ্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠান। এর ফলে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ব্যবস্থায় আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ নির্বাচনের তুলনায় ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।ইসি সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যয় কমানোর জন্য অস্থায়ী ভোটকেন্দ্রের পরিবর্তে স্থায়ী ভোটকেন্দ্রের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। যাতে একদিকে ভোটকেন্দ্রে থাকা সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, অন্যদিকে ব্যয়ও কমানো যায়। ইতোমধ্যে মাঠ কর্মকর্তাদের ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করে স্থায়ী ভবনের ভেতরে ভোটকক্ষ স্থাপনের সুযোগ থাকলে অস্থায়ী ভোটকক্ষ নির্মাণের প্রস্তাব এড়িয়ে যেতে বলা হয়েছে।স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেন, অতীতে কোনো কোনো ইউনিয়নে দুই বা তিনটি ভোটকেন্দ্র থাকলেও এবার প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য আলাদা একটি কেন্দ্র থাকবে। ওয়ার্ডের আকার ছোট হলেও কেন্দ্রের সংখ্যা কমানো হবে না।স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট পেছাতে পারে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা অক্টোবর ধরে কাজ করছি। আগাম বলাটা কঠিন। তবে ভোট পেছাতে কোনো অসুবিধা নেই। আমরা বন্যা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, গড়ে ২ হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র। সাধারণভাবে ৬০০ জন পুরুষ ভোটারের জন্য এবং ৫০০ জন মহিলা ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকক্ষ নির্ধারণ করতে হবে। তবে প্রতিটি ভোটকক্ষে প্রয়োজনে একাধিক গোপনকক্ষ রাখা যাবে।এতে আরও বলা হয়েছে, প্রত্যেক সাধারণ ওয়ার্ডের সীমানার মধ্যে অন্তত একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। তবে বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজন হলে একটি ওয়ার্ডে একাধিক ভোটকেন্দ্রও স্থাপন করা যাবে। ভোটকেন্দ্র এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে ভোটার এলাকাগুলো কেন্দ্রের সংলগ্ন ও সুনিবিড় থাকে এবং দুটি ভোটকেন্দ্রের মধ্যকার দূরত্ব তিন কিলোমিটারের বেশি না হয়। এছাড়া কোনো ভোটারকে নিকটবর্তী কেন্দ্র অতিক্রম করে দূরের কেন্দ্রে যেতে না হয় এবং একটি কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি আরেকটি কেন্দ্র স্থাপন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা নতুন নির্মিত উপযুক্ত স্থাপনাও ব্যবহার করা যাবে।নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কেন্দ্র নির্ধারণে ভোটার সংখ্যা, ভোটকক্ষের সংখ্যা, ভোটারদের যাতায়াতের সুবিধা, ভোটার এলাকার নৈকট্য, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের সুবিধা এবং ভোটকেন্দ্রের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া বিগত নির্বাচনে যেসব ভোটকেন্দ্রে গোলযোগ হয়েছে বা বর্তমানে কোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রভাব থাকার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব স্থাপনাকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। আগের নির্বাচনে ব্যবহৃত কোনো ভোটকেন্দ্র ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেলে, পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকলে বা যাতায়াতের সমস্যা থাকলে নিকটবর্তী অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনাকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করতে হবে। তবে পূর্বে ব্যবহৃত ভোটকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত কক্ষ, যাতায়াতের সুবিধা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বহাল থাকলে সেসব প্রতিষ্ঠানকেই ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৭৬১টি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, এসব কেন্দ্রে মোট ভোটকক্ষের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি।ভোটকেন্দ্র চূড়ান্তে ইসির সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১০ আগস্ট ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে। ভোটকেন্দ্রের খসড়া তালিকার ওপর দাবি-আপত্তি গ্রহণের শেষ তারিখ ১৮ আগস্ট, প্রাপ্ত দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির শেষ তারিখ ২৩ আগস্ট এবং সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে ২৭ আগস্ট। এছাড়া তফসিল ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটকেন্দ্রের তালিকার হার্ড কপি ও সফট কপি বাহকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছে ইসি।ইউনিয়ন পরিষদের রোডম্যাপে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলা, সীমানা-জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়নি। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই ৩ হাজার ৯৮১টি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।পৌরসভার রোডম্যাপ অনুযায়ী, দেশের মোট ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী। আইনি জটিলতার কারণে ১০টি পৌরসভা এখনো নির্বাচন উপযোগী নয়।উপজেলা পরিষদের রোডম্যাপ থেকে জানা যায়, নতুন ৫টি উপজেলাসহ দেশে মোট উপজেলা ৫০০টি। কোনো উপজেলাতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সব উপজেলাই নির্বাচন উপযোগী।রোডম্যাপ অনুযায়ী, নতুন সিটি করপোরেশন বগুড়াসহ ১৩টি সিটি করপোরেশনের কোনোটিতেই নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় সব সিটিই নির্বাচন উপযোগী।২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে ৬১টি জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর ধাপে ধাপে ৫৬টি জেলা পরিষদে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে পৌরসভাগুলোও প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলোতেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।
১৮ ঘন্টা আগে