ঢাকা    শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
ঢাকা    শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা, ফুলবাড়ীতে নতুন করে উদ্বেগ

দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং কয়লা আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশের কয়লাখনিগুলো থেকে উন্মুক্ত বা ওপেন-পিট পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিশ্রণ নিয়ে সরকার মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নীতিও প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।সরকারের এই অবস্থানের পর দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে প্রায় দুই দশক আগে শুরু হওয়া কয়লাখনি-বিরোধী আন্দোলনের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কী ধরনের নির্দিষ্ট প্রকল্প, সময়সূচি বা বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।[TECHTARANGA-POST:678]জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের তাপভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় দুই কোটি টন কয়লা আমদানি করা হয়। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে পূর্ণ সক্ষমতায় বছরে প্রায় দেড় কোটি টন বা তার বেশি কয়লা উত্তোলন করা গেলে আমদানিনির্ভর কয়লার বড় একটি অংশ স্থানীয় উৎস থেকে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। বর্তমানে আমদানি করা কয়লা দেশের কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ওই এলাকার তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হয়।বাংলাদেশে মোট পাঁচটি কয়লাখনি এলাকায় কয়লার মজুদের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে প্রায় ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন, রংপুরের খালাশপীরে ৬৮৫ মিলিয়ন টন, দিনাজপুরের দিঘিপাড়ায় ৭০৬ মিলিয়ন টন, বড়পুকুরিয়ায় ৪১০ মিলিয়ন টন এবং ফুলবাড়ীতে প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদের কথা বলা হয়। ফুলবাড়ীর কয়লাখনি এলাকায় ভূগর্ভের তুলনামূলক অল্প গভীরতায় কয়লার স্তর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি ও আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব মজুদের কতটুকু অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য উপায়ে উত্তোলন করা সম্ভব, সে বিষয়ে পৃথক কারিগরি ও পরিবেশগত মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০০৬ সালে এ পদ্ধতির বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠন আন্দোলনে অংশ নেয়। আন্দোলনকারীদের মূল আশঙ্কা ছিল, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খনি করলে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে পরিবর্তন আসতে পারে এবং পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি বহু মানুষকে অন্যত্র স্থানান্তর করতে হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।সম্প্রতি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা সামনে আসার পর ওই আশঙ্কাগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হলেও এর সঙ্গে কৃষি, পরিবেশ, পানি, বসতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।[TECHTARANGA-POST:680]অন্যদিকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পক্ষে আলোচনায় মূলত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার চাহিদা এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চললেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।এদিকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের ঘোষণার প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকট সমাধান, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা ও জ্বালানি খাতের বেসরকারীকরণ বন্ধ, ওষুধের সরকারি মূল্যনিয়ন্ত্রণ কার্যকর এবং মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলসহ ছয় দফা দাবিতে ২৪ আগস্ট ঢাকা থেকে ফুলবাড়ীর উদ্দেশে ‘প্রচার যাত্রা’ শুরু করা হবে। ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে গণসমাবেশের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।এর আগে গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে ফুলবাড়ী পৌর শহরের নিমতলা মোড়ে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাবের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে গণসংহতি আন্দোলন। সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা মিছিল শেষে সেখানে সমাবেশ করেন।ফলে দীর্ঘ বিরতির পর ফুলবাড়ীর কয়লাখনি আবারও জাতীয় জ্বালানি নীতি ও স্থানীয় রাজনীতির আলোচনায় এসেছে। একদিকে জ্বালানি আমদানির চাপ কমিয়ে দেশের নিজস্ব কয়লা সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনা, অন্যদিকে কৃষিজমি, পানি, পরিবেশ, বসতি ও মানুষের জীবন-জীবিকার সম্ভাব্য প্রভাব দুই দিক বিবেচনা করেই বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আলোচনা, ফুলবাড়ীতে নতুন করে উদ্বেগ