দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, প্রত্যাখ্যান ইরানের

চলমান উত্তেজনা প্রশমন মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। একই সঙ্গে প্রথমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নতি স্বীকার’ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর প্রথম পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়ে ‘অত্যন্ত কঠোর ও অনমনীয়’ অবস্থান গ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। তবে সর্বোচ্চ নেতা সশরীরে না কি ভার্চুয়ালি ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করেননি।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুটি মধ্যস্থতাকারী দেশ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমানো বা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সেই প্রস্তাব কি ছিল বা মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর নাম উল্লেখ করেনি তিনি।ওই প্রস্তাবের জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ‘যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল নতি স্বীকার করে পরাজয় মেনে নিচ্ছে এবং ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে, ততক্ষণ শান্তির জন্য এটি সঠিক সময় নয়।’প্রসঙ্গত, ইরানের রাষ্ট্রীয় সকল বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। তবে এক সপ্তাহ আগে পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নতুন কোনও ছবি প্রকাশ করা হয়নি। কিছু ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার জন্য চালানো মার্কিন ইসরায়েলি হামলায় সামান্য আহত হয়েছেন। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, তিনি গুরুতর আঘাত পেয়েছেন।[TECHTARANGA-POST:158]ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং সংঘাত থামার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাহায্য চাওয়ার অনুরোধ তার মিত্ররা প্রত্যাখ্যান করেছে। এর ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর গত সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত প্রথম বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুদের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।গত ১৪ মার্চ তিনটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছিল, ইরান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করেছে।ইরান যুদ্ধবিরতি চায় না কেন? ইরানের কর্মকর্তারা সবসময় জোর দিয়ে বলেন, দেশটি দীর্ঘমেয়াদি মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত এবং এই বার্তা দিয়েই তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য ধৈর্য ও প্রস্তুতির একটি চিত্র তুলে ধরতে চান।সম্প্রতি ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি ঘোষণা করেন, ইরান একটি দীর্ঘ সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়, দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে’।দেশটির কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, যা ইঙ্গিত করে যে সংঘাত কয়েক মাস বা তার চেয়েও দীর্ঘকাল চলতে পারে।ইরানি সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ গত ৮ মার্চ বলেন, ‘আমরা অবশ্যই যুদ্ধবিরতি চাইছি না। আমাদের আক্রমণকারীকে শাস্তি দিতেই হবে’। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে একটি অস্তিত্বগত যুদ্ধে লিপ্ত।ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালায়েনিকও বলেছেন, ইরান ‘আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা’ শত্রুর প্রত্যাশার চেয়ে বহু গুণ বেশি সময় ধরে বজায় রাখতে পারে।তিনি আরও বলেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে তার অস্ত্র ব্যবহারের ধাপগুলো ভাগ করে চালাচ্ছে—অর্থাৎ সব সক্ষমতা একসঙ্গে নয়, বরং আরও উন্নত সক্ষমতার কিছু অংশ পরবর্তী পর্যায়ের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।ইরানের কৌশল কী?কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইরান এমন একটি কৌশলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ইরানি বাহিনী ধারাবাহিকভাবে বা ধাপে ধাপে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্বার্থের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করছে।এ ধরনের হামলার কয়েকটি লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, এগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বাধ্য করে আগত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্রিয় হতে। প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো এসব ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিত সংখ্যক, এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিরোধই ধ্বংস করা ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের তুলনায় বেশি ব্যয়সাপেক্ষ।দ্বিতীয়ত, ধারাবাহিক হামলা দেশগুলোর প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ও সামরিক প্রস্তুতিকে চাপে ফেলতে পারে।ওয়াশিংটন পোস্ট–এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী লড়াইয়ের প্রথম সপ্তাহেই দ্রুতগতিতে সুনির্দিষ্ট অস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। অন্যান্য বিশ্লেষকরা বলেন, অতিরিক্ত অস্ত্র ব্যবহারের এই মাত্রা ‘সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা’ উন্মোচিত করছে।ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের অস্ত্র সরবরাহ অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং সশস্ত্র বাহিনী ‘বর্তমান গতিতে অন্তত ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে’।দেশটির কয়েকজন কমান্ডার আরও বলেছেন, ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে দেশীয়ভাবে হয় এবং একাধিক উৎপাদন কেন্দ্র ও বড় মজুত থাকার কারণে ইরান দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালাতে সক্ষম।ইরান মনে হচ্ছে সময় ধরে হামলাগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে প্রতিপক্ষকে হঠাৎ, সিদ্ধান্তমূলক কোনো বৃহৎ আক্রমণের মুখে পড়ার বদলে একটানা প্রতিরক্ষা বজায় রাখতে হয়। এই কৌশলটি একটি বৃহত্তর সামরিক মতবাদের প্রতিফলন, যা ইরান কয়েক দশকের মধ্যে বৃহত্তর শক্তিধর দেশগুলোর সামরিক সুবিধা মোকাবিলায় গড়ে তুলেছে।১৯৮০–এর দশকের ইরান–ইরাক যুদ্ধের পর ইরান অসম যুদ্ধ কৌশলে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। এই পদ্ধতি এমন সরঞ্জাম ও কৌশলের ওপর গুরুত্ব দেয়, যা প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের ওপর নির্ভর না করেই শক্তিশালী বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। লক্ষ্য সবসময় শক্তিশালী শত্রুকে সরাসরি পরাজিত করা নয়, বরং যেকোনো সামরিক সংঘাতকে ব্যয়বহুল, দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত করে তোলা।

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, প্রত্যাখ্যান ইরানের