বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য। ঘটনার রাতে ছোট ভাইতুল্য বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে উত্তরার বারে যাওয়া, প্রেমিকাকে পৌঁছে দেওয়া এবং পরবর্তীতে টঙ্গীর মাজার বস্তি মাঠে মাদক কেনাবেচার স্থানে যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তবে সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় তাহসিফ পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, এ বিষয়ে ধোঁয়াশায় তদন্তকারীরা।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা দীপের কাছে জানতে চান, তাহসিফ কি দুর্ঘটনাবশত পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি নিজে থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কিংবা তাকে হত্যা করা হয়েছিল? কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাবে দীপ বারবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে তাহসিফের পানিতে পড়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তাহসিফের মৃত্যু আসলে কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তার শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এখন ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। তার শরীরে বিষ কিংবা মাদকজাতীয় কোনো উপাদান ছিল কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এসব প্রতিবেদন পেতে কিছুটা সময় লাগবে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই কেবল নিশ্চিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে; এর আগে কোনো আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।’ তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় তরুণদের দৌড়ে পালানোর বিষয়টিকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রাস্তার পাশের ছোট ছোট দোকানিরা যেমন পুলিশ দেখলে দোকান গুটিয়ে ফেলেন এবং কিছুক্ষণ পর আবার খুলে বসেন, ওই তরুণেরাও পুলিশ দেখে একইভাবে দৌড় দিয়েছিলেন। তবে দীপ ছাড়া এই ঘটনার আর কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই।
ওই তরুণেরা স্থানীয় খুচরা মাদক কারবারি বলেও জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন, সেই রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করা যায়নি। তাকে আগে থেকে কেউ বিষ প্রয়োগ করেছিলেন কি না কিংবা তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দীপ যেসব তথ্য দিচ্ছেন, সেগুলো যাচাই না করে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। অন্যরা দৌড়ে পালানোর সময় তিনিও কি সবার সঙ্গে দৌড়ে পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।’
দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে নৌপুলিশকে সহায়তা করছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে মামলা রুজু হলে দীপকে পিবিআইয়ের হেফাজত থেকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার রাতে বারে তাহসিফ, প্রেমিকা ও দীপ
তদন্তে উঠে এসেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে এক নারী ছিলেন, যিনি তার প্রেমিকা বলে জানা গেছে। ওই দিন রাত ১০টা ১৭ মিনিটের দিকে তাহসিফ, ওই নারী ও দীপ উত্তরার একটি বারে যান।
বারের ভবনের সামনে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে ওই নারীকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। অন্যদিকে অপর একটি মোটরসাইকেলে করে সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে করে বারে প্রবেশ করেন।
এ বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই রাতে তিনজন একসঙ্গে বারে গিয়েছিলেন, বিষয়টি সঠিক। ওই নারী তাহসিফের প্রেমিকা। বার থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ তাকে নিজের বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তাহসিফ ও দীপ আবারও সেখান থেকে বের হন। তবে ওই নারী পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে ঘটনাস্থল পর্যন্ত যাননি।’
সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে নৌ পুলিশ
আদালতে পেশ করা নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির আবেদনপত্রে (ফরওয়ার্ডিং) তাহসিফ হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে দীপকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ হত্যাকাণ্ডে দীপের জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাকে সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
নৌ পুলিশের আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ ফোন করে তাহসিফকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে পুলিশ খবর পায়, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদে একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ ভাসছে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায় এবং জানা যায়, তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা।

এতে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে দীপ টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ স্বীকার করেন, নিহত তাহসিফ তার সিনিয়র বড় ভাই ছিলেন।
নৌ পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে (দীপ) আটক রাখা প্রয়োজন, কারণ জামিনে মুক্তি পেলে তিনি আত্মগোপনে চলে যেতে পারেন এবং তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন।
তাই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও মোটিভ উদ্ঘাটন, জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারের লক্ষ্যে দীপকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে নৌ পুলিশ।
দীপের ভূমিকা নিয়ে তাহসিফে বাবার প্রশ্ন
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধু দীপের ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বলেন, ‘দীপের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। দীপ প্রথমে আমাদের বলেছিল, সে নাকি তাহসিফকে বাসার কম্পাউন্ডে নামিয়ে রেখে গেছে। অথচ পিবিআইয়ের তদন্তে পরে স্বীকার করেছে, তারা দুজনে একসঙ্গে টঙ্গীতে গিয়েছিল।’
শনিবার (৩১ অক্টোবর) উত্তরায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাহসিফের বাবা আরও জানান, এ ঘটনার পেছনে কে বা কারা জড়িত এবং ঠিক কী ঘটেছিল, তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন না। তিনি তার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে ‘রাওয়া’
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা ‘রাওয়া’। শনিবার (৩১ অক্টোবর) উত্তরায় তাহসিফের বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাওয়ার নেতারা।
সাক্ষাৎ শেষে রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম জানান, তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এবং এ ঘটনায় কোনো ধরনের আইনি বা অন্যান্য সহযোগিতা প্রয়োজন কি না, তা জানতে গিয়েছিলেন। এ সময় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম তাদের জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাটি অনুসন্ধান করছে এবং মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

রাওয়া নেতারা আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত ঘটনার প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হবে এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় তারা তাহসিফের পরিবারের পাশে থাকার এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন জানান, তারা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণে রাখবেন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চান।
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ফোনে সাড়া দিয়ে উত্তরার বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। সে সময় মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাহসিফের বন্ধু দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে তাকে নৌ পুলিশের (টঙ্গী ফাঁড়ি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে এই হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে নৌ পুলিশ। মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার (৩১ অক্টোবর) দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। -নিউজ ডেস্ক

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় উঠে আসছে নতুন নতুন তথ্য। ঘটনার রাতে ছোট ভাইতুল্য বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে উত্তরার বারে যাওয়া, প্রেমিকাকে পৌঁছে দেওয়া এবং পরবর্তীতে টঙ্গীর মাজার বস্তি মাঠে মাদক কেনাবেচার স্থানে যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তবে সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় তাহসিফ পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, এ বিষয়ে ধোঁয়াশায় তদন্তকারীরা।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারীরা দীপের কাছে জানতে চান, তাহসিফ কি দুর্ঘটনাবশত পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি নিজে থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কিংবা তাকে হত্যা করা হয়েছিল? কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাবে দীপ বারবার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে তাহসিফের পানিতে পড়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তাহসিফের মৃত্যু আসলে কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তার শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এখন ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। তার শরীরে বিষ কিংবা মাদকজাতীয় কোনো উপাদান ছিল কি না, তা-ও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। এসব প্রতিবেদন পেতে কিছুটা সময় লাগবে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই কেবল নিশ্চিত তথ্য দেওয়া সম্ভব হবে; এর আগে কোনো আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।’ তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় তরুণদের দৌড়ে পালানোর বিষয়টিকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। রাস্তার পাশের ছোট ছোট দোকানিরা যেমন পুলিশ দেখলে দোকান গুটিয়ে ফেলেন এবং কিছুক্ষণ পর আবার খুলে বসেন, ওই তরুণেরাও পুলিশ দেখে একইভাবে দৌড় দিয়েছিলেন। তবে দীপ ছাড়া এই ঘটনার আর কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই।
ওই তরুণেরা স্থানীয় খুচরা মাদক কারবারি বলেও জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন, সেই রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করা যায়নি। তাকে আগে থেকে কেউ বিষ প্রয়োগ করেছিলেন কি না কিংবা তিনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলেন কি না, তা-ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দীপ যেসব তথ্য দিচ্ছেন, সেগুলো যাচাই না করে বিশ্বাস করার সুযোগ নেই। অন্যরা দৌড়ে পালানোর সময় তিনিও কি সবার সঙ্গে দৌড়ে পানিতে পড়ে গিয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়। এসব বিষয় নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন।’
দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে নৌপুলিশকে সহায়তা করছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে মামলা রুজু হলে দীপকে পিবিআইয়ের হেফাজত থেকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার রাতে বারে তাহসিফ, প্রেমিকা ও দীপ
তদন্তে উঠে এসেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে এক নারী ছিলেন, যিনি তার প্রেমিকা বলে জানা গেছে। ওই দিন রাত ১০টা ১৭ মিনিটের দিকে তাহসিফ, ওই নারী ও দীপ উত্তরার একটি বারে যান।
বারের ভবনের সামনে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে ওই নারীকে নিয়ে সেখানে পৌঁছান। অন্যদিকে অপর একটি মোটরসাইকেলে করে সেখানে আসেন দীপ। পরে তিনজন একসঙ্গে লিফটে করে বারে প্রবেশ করেন।
এ বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই রাতে তিনজন একসঙ্গে বারে গিয়েছিলেন, বিষয়টি সঠিক। ওই নারী তাহসিফের প্রেমিকা। বার থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ তাকে নিজের বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তাহসিফ ও দীপ আবারও সেখান থেকে বের হন। তবে ওই নারী পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে ঘটনাস্থল পর্যন্ত যাননি।’
সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে নৌ পুলিশ
আদালতে পেশ করা নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির আবেদনপত্রে (ফরওয়ার্ডিং) তাহসিফ হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে দীপকে গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ হত্যাকাণ্ডে দীপের জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাই মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের স্বার্থে তাকে সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
নৌ পুলিশের আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ ফোন করে তাহসিফকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে পুলিশ খবর পায়, উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন তুরাগ নদে একটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ ভাসছে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় নিহতের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায় এবং জানা যায়, তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা।

এতে আরও বলা হয়, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে দীপ টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ স্বীকার করেন, নিহত তাহসিফ তার সিনিয়র বড় ভাই ছিলেন।
নৌ পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে (দীপ) আটক রাখা প্রয়োজন, কারণ জামিনে মুক্তি পেলে তিনি আত্মগোপনে চলে যেতে পারেন এবং তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন।
তাই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ ও মোটিভ উদ্ঘাটন, জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারের লক্ষ্যে দীপকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে নৌ পুলিশ।
দীপের ভূমিকা নিয়ে তাহসিফে বাবার প্রশ্ন
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তার বন্ধু দীপের ভূমিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বলেন, ‘দীপের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ। দীপ প্রথমে আমাদের বলেছিল, সে নাকি তাহসিফকে বাসার কম্পাউন্ডে নামিয়ে রেখে গেছে। অথচ পিবিআইয়ের তদন্তে পরে স্বীকার করেছে, তারা দুজনে একসঙ্গে টঙ্গীতে গিয়েছিল।’
শনিবার (৩১ অক্টোবর) উত্তরায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তাহসিফের বাবা আরও জানান, এ ঘটনার পেছনে কে বা কারা জড়িত এবং ঠিক কী ঘটেছিল, তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন না। তিনি তার ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে ‘রাওয়া’
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা ‘রাওয়া’। শনিবার (৩১ অক্টোবর) উত্তরায় তাহসিফের বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রাওয়ার নেতারা।
সাক্ষাৎ শেষে রাওয়ার যুগ্ম সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম জানান, তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে এবং এ ঘটনায় কোনো ধরনের আইনি বা অন্যান্য সহযোগিতা প্রয়োজন কি না, তা জানতে গিয়েছিলেন। এ সময় তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম তাদের জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাটি অনুসন্ধান করছে এবং মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

রাওয়া নেতারা আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত ঘটনার প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হবে এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় তারা তাহসিফের পরিবারের পাশে থাকার এবং সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন জানান, তারা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণে রাখবেন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তসহ জড়িত ব্যক্তিদের বিচার চান।
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ফোনে সাড়া দিয়ে উত্তরার বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। সে সময় মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাহসিফের বন্ধু দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরে তাকে নৌ পুলিশের (টঙ্গী ফাঁড়ি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে এই হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে নৌ পুলিশ। মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার (৩১ অক্টোবর) দীপকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। -নিউজ ডেস্ক

আপনার মতামত লিখুন