ঢাকা    বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
ঢাকা    বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩
দিনাজপুর টোয়েন্টিফোর

ভ্যাট আদায়ে খাদের কিনারে এনবিআর

এক দশক ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তিন অনুবিভাগের মধ্যে রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত ছিল ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক)। তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গিয়ে রাজস্ব আহরণের প্রধান এ খাতটি এখন বিপর্যয়ের মুখে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভ্যাট আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, আদায় হয়েছে তার অর্ধেক। অর্থাৎ অর্ধেকই ঘাটতি। এমনকি আদায় করা ভ্যাটের পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়েও কম। ভ্যাটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার নামে ভ্যাটের রিটার্ন প্রতি মাসে জমার পরিবর্তে তিন মাস করার কারণে এ বিপর্যয় নেমে এসেছে। এ ছাড়া, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার বিরূপ প্রভাব ভ্যাট আদায়ে পড়েছে বলেও মনে করছেন তারা।এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। বিশাল এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ধারেকাছেও নেই এনবিআর। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের ভ্যাট কমিশনারেটগুলো আদায় করেছে ২৮ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। বাকি ২৮ হাজার ১৪৬ কোটি টাকাই ঘাটতি। অর্থাৎ গত তিন মাসে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেকই ঘাটতি। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এনবিআরের ভ্যাট আদায়ের গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাইনাস ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশে। এ ছাড়া, চলতি অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে আদায় করা ভ্যাটের পরিমাণ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা কম। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এনবিআর ভ্যাট আদায় করেছিল ৩৩ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।[TECHTARANGA-POST:816]জানতে চাইলে এনবিআরের ভ্যাট বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য সৈয়দ মুসফিকুর রহমান  বলেন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কম ভ্যাট এসেছে। এ ছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট আদায় কম হয়েছে। সবমিলিয়ে ভ্যাট আদায় কম হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ভ্যাট আদায় বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এনবিআরের এ কর্মকর্তা।সূত্র জানায়, এনবিআরের মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটে। গত তিন মাসে এলটিইউ ভ্যাট আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ হাজার ২০৮ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে এলটিইউ ভ্যাট আদায় হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম, মাত্র ১২ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভ্যাটের সবচেয়ে বড় কমিশনারেটের ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা, যেখানে প্রবৃদ্ধি হিসাব করলে দাঁড়ায় মাইনাস ৩১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অথচ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে আরও ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি এলটিইউ ভ্যাট আদায় হয়েছিল। দেশের আরেকটি বৃহৎ ভ্যাট কমিশনারেট চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেটে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে চট্টগ্রাম ভ্যাট কমিশনারেট আদায় করেছে ৩ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ চট্টগ্রামে তিন মাসে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা; আর প্রবৃদ্ধি মাইনাস ১৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। [TECHTARANGA-POST:810]একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঢাকা দক্ষিণে ভ্যাট আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৯৭৮ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি হিসাব করলে যা দাঁড়ায় মাইনাস ৯ দশমিক ৫১ শতাংশে। বরিশাল ভ্যাট কমিশনারেটের ভ্যাট আদায়ের চিত্রও প্রায় একই। সেখানে প্রবৃদ্ধি মাইনাস ১৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ।জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক সদস্য (ভ্যাট নীতি) ড. আব্দুর রউফ বলেন, একযুগ ধরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশের ঘরে। নতুন করে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সেই হিসাব করলে আরও প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ ভ্যাট আদায় স্বাভাবিকভাবে বাড়ার কথা। সেখানে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উল্টো ১৫ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে ভ্যাট আহরণ নিয়ে সমীক্ষা ছাড়া এক্সপেরিমেন্ট। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার নামে তিন মাস অন্তর অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম করার কারণে ভ্যাট আদায়ে এ বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।কারণ হিসেবে এনবিআরের সাবেক এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তিন মাস অন্তর অন্তর ভ্যাট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে ব্যবসায়ীরা জুলাই-আগস্টে রিটার্ন জমা দেননি। এখন সেপ্টেম্বরে এসে এ বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। কারণ ব্যবসায়ীরা আগে প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেওয়ার কারণে সরকার সঠিক সময়ে ভ্যাট পেত। এখন সমীক্ষা ছাড়া এ সুবিধা দেওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা প্রথমে এমপ্লয়িদের বেতন ভাতা থেকে শুরু করে ব্যাংক এবং ভেন্ডরের পেমেন্ট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দিয়ে থাকেন। এখন তিন মাস পর এসে আর আগের মতো ভ্যাট আসছে না। তাই অন্তত রাজস্ব আহরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বিষয়গুলো আগে বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।[TECHTARANGA-POST:814]এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠপর্যায়ে শুধু তিন মাস অন্তর অন্তর ভ্যাটের রিটার্ন জমার বিরূপ প্রভাবই পড়েনি, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এনবিআরের বর্তমান প্রশাসনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং মনিটরিং। এ ছাড়া, এনবিআরের বিগত দিনের আন্দোলনের কারণে এখনো অনেক কর্মকর্তার কাজে মনোযোগ নেই। হুটহাট করে কমিশনার পরিবর্তন থেকে শুরু করে ঠুনকো অজুহাতে বদলির অভিযোগও তুলেছেন তারা। তারা বলছেন, নির্ধারিত কিছু কর্মকর্তা কাস্টম হাউস থেকে বন্ড ভ্যাটে ঢাকার মধ্যেই পদায়ন নিচ্ছেন। অন্যদিকে, কিছু কর্মকর্তা দিনের পর দিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করছে। আবার নতুন প্রশাসন এলে কিছু কর্মকর্তা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সব মিলিয়ে এ বৈষম্যের কারণে ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়া গতি হারিয়েছে বলেও জানিয়েছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। --সূত্র : কালবেলা

ভ্যাট আদায়ে খাদের কিনারে এনবিআর