স্মার্ট কার্ডের ‘বিকল্প ভাবনা’ এনআইডি ডিজির
প্রায় দেড় দশক আগে নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) চালুর লক্ষ্যে উদ্যোগ নেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের অধীন আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের মাধ্যমে স্মার্ট এনআইডি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো দেশের সব নাগরিককে উন্নতমানের এই কার্ড সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।এ অবস্থায় স্মার্ট কার্ডের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সদ্য দায়িত্ব নেওয়া জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা। ইতোমধ্যে স্মার্ট কার্ড প্রকল্প বন্ধ করে ‘একআইডি’ (ekid) নামে নতুন এক কার্ডের পরিকল্পনা কমিশনের কাছে উপস্থাপন করতে তিনি একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে।নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আনোয়ার পাশা চিপভিত্তিক স্মার্ট কার্ডের পরিবর্তে বিকল্প একটি ব্যবস্থা চালুর পক্ষে প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন।ইসি সূত্র জানায়, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্মার্ট কার্ড উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি শুরুতে ‘একটি মাত্র পরিচয়পত্রের মাধ্যমে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা’র যে লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল-তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।এরই মধ্যে এনআইডির নতুন ডিজি স্মার্ট কার্ড প্রকল্প বন্ধ করে নতুন ধরনের পরিচয়পত্র ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে। তার প্রস্তাবনায় ‘একআইডি’ (ekid) নামে একটি নতুন জাতীয় পরিচয় ব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরা হতে পারে, যা কমিশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।ইসি সূত্রের দাবি, নতুন প্রস্তাবনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক পরিচয় ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এতে চিপভিত্তিক কার্ডের পরিবর্তে ‘ক্লাউডভিত্তিক ডিজিটাল আইডি’ অথবা স্মার্টফোনভিত্তিক ‘ডাইনামিক ভেরিফিকেশন’ পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন।এছাড়া আমেরিকা, ইউরোপসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে কী ধরনের আইডি ব্যবহার হয়, তার সুবিধা-অসুবিধার কথাও বলা হয়েছে। সবশেষে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের স্মার্ট কার্ড উৎপাদন বন্ধ করে ‘ekid’ নামের নতুন আইডি ব্যবস্থার ধারণা উপস্থাপন করবেন।ইসি সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যবহৃত স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল। তবে সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই কার্ড চালু করা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য পূরণে এর কোনো কার্যকর বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। তাদের মতে, সম্পূর্ণভাবে ফিজিক্যাল কার্ড ব্যবস্থা বাদ দেওয়া হলে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। কারণ, গ্রামাঞ্চলের অনেক নাগরিক এখনো পর্যাপ্তভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ নন। এ অবস্থায় মোবাইলভিত্তিক বা ক্লাউড-নির্ভর ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থা কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, স্মার্ট এনআইডি কার্ডের মাইক্রোচিপে নাগরিকের পেশা, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, জন্ম নিবন্ধন নম্বর, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন, ধর্ম, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্ট নম্বর, আয়কর সনদ নম্বর, টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর, মা-বাবা ও স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়পত্র নম্বর, তাদের মৃত্যুসংক্রান্ত তথ্য, প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত তথ্যসহ নানা ধরনের তথ্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা ছিল। এই চিপটি এনএফসি প্রযুক্তিনির্ভর এবং শক্তিশালী এনক্রিপশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষিত, যা সাধারণ ডিভাইসে সহজে পড়া সম্ভব নয়।এ ছাড়া ব্যাংকিং সেবা, এটিএম ব্যবহার, ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবা একটি মাত্র কার্ডের মাধ্যমে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েই এই উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। তবে বাস্তবে বর্তমানে এনআইডি মূলত পরিচয় শনাক্তকরণ ও নম্বরভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। একক কার্ডের মাধ্যমে সব ধরনের সেবা একীভূত করার যে লক্ষ্য ছিল, তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।ইসি সূত্রে এসব বিষয় জানা গেলেও এরকম কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা।স্মার্ট প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসা কিংবা এর পরিবর্তে অন্য আইডি প্রদানের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ার পাশা বলেন, ‘এরকম কোনো পরিকল্পনা আমার নেই। আমি মাত্র যোগদান করেছি। এজন্য সবকিছু বোঝার চেষ্টা করছি। আমি এখন শুধুই বোঝার চেষ্টা করছি। যখন বুঝতে পারব, পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করব। কর্তৃপক্ষ যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেভাবেই বাস্তবায়ন হবে।এনআইডির স্মার্ট কার্ডের প্রকল্প সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসির সচিব আখতার আহমেদ জানান, ‘স্মার্ট কার্ড বা আইডিইএ প্রকল্প নভেম্বর পর্যন্ত আছে। এরপর কী হবে তা পরবর্তীতে ভাবা হবে।’স্মার্ট কার্ডের চিপ ব্যবহার হচ্ছে না, অথচ ৮০০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হলো-এমন বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসি সচিব বলেন, ‘চিপে ডেটা আছে, কিন্তু চিপ রিডারটা নেই। এখন আমি তো আপনাকে অস্বীকার করতে পারছি না। যেটা হয়েছে সেটা হয়েছে। রিডার নেই—এই সত্যিটা তো আমি স্বীকার করছি। আমার কাছে অস্বীকার করার কিছু নেই।আখতার আহমেদ আরো বলেন, ‘চিপে বেসিক কিছু ডেটা আছে, যেটা সবার জন্য-নিজের নাম, ছবি, বাবার নাম, মায়ের নাম, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, রক্ত, ধর্ম এগুলো বেসিক। এগুলো তো চেঞ্জ হয় না। সুতরাং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডেটা ব্যবহার করতে পারে। আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ডেটা ব্যবহার করব।ইসির তৈরি এনআইডির স্মার্ট কার্ড বিতরণের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এখন পর্যন্ত ইসি মোট স্মার্ট কার্ড পেয়েছে ৮ কোটি ৬৭ লাখ ১২ হাজার ২৬৬টি। এর মধ্যে নাগরিকদের হাতে দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৪৬টি। অবশিষ্ট রয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮১ হাজার ২২টি। অন্যদিকে ৫২২টি উপজেলার মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণের কাজ শেষ করা হয়েছে ৪০৪টি উপজেলায়। বিতরণ কার্যক্রম চলমান ছিল একটি উপজেলায়, যা বর্তমানে স্থগিত। কার্ড প্রিন্ট করা হয়েছে কিন্তু বিতরণ হয়নি—এমন উপজেলা রয়েছে ২টি, আর প্রিন্ট করা হয়নি ১১৫টি উপজেলায়।ইসি সূত্র জানায়, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে প্রথম ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে এ ভোটার কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর প্রেক্ষিতে নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১১ সালে আইডিইএ (স্মার্ট কার্ড) প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। নানা জটিলতা কাটিয়ে চার বছর পর, ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি ১৮ মাসের মেয়াদে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান অবার্থার টেকনোলজিসের সঙ্গে ৯ কোটি নাগরিকের জন্য ৯ কোটি স্মার্ট কার্ড তৈরির চুক্তি করে ইসি। এরপর ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর স্মার্ট কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে সংস্থাটি। কিন্তু মেয়াদ বৃদ্ধির পরও ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত শর্ত অনুযায়ী কার্ড দিতে না পারায় চুক্তি বাতিল করা হয় এবং ওই বছরের শেষে অবার্থারের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়।ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০১৭ সাল পর্যন্ত অবার্থার ১ দশমিক ৫১ ডলার দরে ৭ কোটি ৭৩ লাখ কার্ড সরবরাহ করতে পেরেছিল। সে সময়ই কার্ডের ঘাটতি ছিল ১ কোটি ২৭ লাখ। এই কয়েক বছরে ভোটার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৯৩ জন। সব মিলিয়ে আরও প্রায় ৪ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩৫টি ব্ল্যাংক কার্ড প্রয়োজন পড়বে সকল নাগরিককে উন্নতমানের এ কার্ড দিতে।কর্মকর্তারা আরও জানান, অবার্থারের সঙ্গে চুক্তি শেষ হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে এই কার্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসি। এদিকে ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও স্মার্ট কার্ড প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর রাজস্ব খাত থেকে প্রকল্পের ব্যয় মেটানো হচ্ছে। আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আইডিইএ দ্বিতীয় প্রকল্প হাতে নেয় কমিশন। এই প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে ৪০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকায় তিন কোটি ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ড সরবরাহ করার কথা ছিল। কয়েক বছরে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিতে পরিবর্তন এনে কার্ডপ্রতি ১৩৫ দশমিক ৫০ টাকার পরিবর্তে ৩৬ দশমিক ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৭২ টাকা করে ২ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড কেনার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। বর্তমানে সব নতুন ভোটারকে সাধারণ কার্ড দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
৩ ঘন্টা আগে