বিদ্যুৎ খাতে ১০ হাজার কোটির প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে!
২০১৮ সালে একনেকে প্রকল্প অনুমোদনভৌত অগ্রগতি ৯৩% ছাড়ালেও কাজ অসম্পূর্ণসচল রাখতে সীমিতভাবে চালানোর সিদ্ধান্তঅতিরিক্ত ব্যয় অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছেগ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের দুর্বলতা এবং ধারাবাহিক কারিগরি জটিলতায় খুলনায় নির্মাণাধীন রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের কাজ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়ানোর পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিশনিং সম্পন্ন করা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি, বিলম্বের কারণ এবং করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় উপস্থাপিত তথ্যে জানা যায়, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২২ মে একনেক সভায় অনুমোদন পায়। প্রায় ৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি শুরুতে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। মোট ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ২ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়নের জন্য ২০১৮ সালের ২ আগস্ট এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। সর্বশেষ সংশোধিত সময়সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সময়সীমা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে এখন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।প্রকল্পের আওতায় দুটি গ্যাস টারবাইন, দুটি স্টিম টারবাইন, দুটি হিট রিকভারি স্টিম জেনারেটর, পাওয়ার ট্রান্সফরমার, ডিস্ট্রিবিউটেড কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্যাকেজভিত্তিক কাজের মধ্যে মূল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, সঞ্চালন লাইন নির্মাণ এবং গ্যাস সরবরাহ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯৩ দশমিক ৪৭ শতাংশে পৌঁছালেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও কমিশনিং পর্যায়ে এসে প্রকল্পটি বড় ধরনের জটিলতায় পড়েছে। প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী হাসিবুল হাসান জানান, প্রথম ইউনিটের ইরেকশন কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে ইউনিটটি জাতীয় গ্রিডে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়। প্রথমে এইচএসডি জ্বালানি ব্যবহার করে এবং পরে গ্যাস দিয়ে গ্রিডে যুক্ত করা হলেও গ্যাস টারবাইনে উচ্চ কম্পনের সমস্যা ধরা পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে একাধিকবার মেরামত কাজ করতে হয়েছে।তিনি জানান, বেয়ারিং রিয়ালাইনমেন্ট, মাস ব্যালান্সিংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। নতুন বেয়ারিং প্রতিস্থাপনের পরও একই সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে টারবাইনের রোটরে স্ক্র্যাচ শনাক্ত হওয়ায় সেটি মেশিনিং করে মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। এ কাজ সম্পন্ন করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তা প্রয়োজন এবং এতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।এদিকে গ্যাস সরবরাহ নিয়েও প্রকল্পটি অনিশ্চয়তায় রয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হলেও কমিশনিং কার্যক্রমের সঙ্গে সেই সময়সূচির সমন্বয় করা যায়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলেও গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে সেটিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।কমিশনিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাহিদা বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়েছে এবং জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে পেট্রোবাংলার সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবু গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সভায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পটির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব দ্রুত বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণচুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকল্পের অর্থায়ন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন রাখা যায়।সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বলেন, ইতোমধ্যে প্রকল্পটিতে বিপুল বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। তাই মাঝপথে থামিয়ে না রেখে যেকোনো মূল্যে এটি শেষ করতে হবে। তবে এর জন্য গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা, কারিগরি ত্রুটির দ্রুত সমাধান এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রকল্পটির একটি বড় বাস্তবতা। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই কমিশনিং পরিকল্পনায় শীতকালকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন সময়সূচি নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।সভায় আরও জানানো হয়, প্রকল্প বিলম্বিত হওয়ায় ‘কমিটমেন্ট চার্জ’সহ অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ বাড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড-ও (নওপাজেকো) নির্ধারিত সময়ে কমিশনিং সম্পন্ন করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রপাতির মূল্য বৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় ব্যয় কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। তবে ইপিসি চুক্তির মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় মোট ব্যয় প্রায় ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা না নিলে সময় ও ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে, যা বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিস্থিতি মূল্যায়নে গত ডিসেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) কে এম আলী রেজার নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সম্প্রতি কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপস্ট্রিম গ্যাস রেশনিংয়ের মাধ্যমে এলেঙ্গা প্রান্তে গ্যাসের চাপ ৪১০ পিএসআইর বেশি হলে সিরাজগঞ্জ ও ভেড়ামারা বিদ্যুৎকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে রূপসা কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট কমিশনিং করা যেতে পারে।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেন্দ্রটি পূর্ণমাত্রায় চালাতে গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য গ্যাসচালিত কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হবে। আবার সেগুলো বন্ধ রাখলে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণে তেলচালিত কেন্দ্র চালাতে হবে, যা ব্যয় বাড়াবে। ফলে প্রকল্পটি এখন এক ধরনের আর্থিক ও জ্বালানি দ্বৈত সংকটে পড়েছে।বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানির নিশ্চয়তা ছাড়া কেন্দ্র নির্মাণের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন চালু করলে লোকসান, আর বন্ধ রাখলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি-দুই ধরনের চ্যালেঞ্জই সামনে। তাই আপাতত যন্ত্রপাতি সচল রাখতে সীমিত পরিসরে চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, গ্যাসের অভাবে কেন্দ্রটি কমিশনিং করা যাচ্ছে না। এটি গ্যাস পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে হওয়ায় চালাতে হলে আপস্ট্রিমের অন্যান্য কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হবে, যা বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই কেন্দ্রটিকে সচল রাখার জন্য বছরে কয়েকবার চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, সরকার একটি দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। অতীতের প্রকল্পগুলো কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, তা এখন মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অকার্যকর প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, বরং সেগুলো পুনর্বিন্যাস করে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটে বন্ধ থাকবে কি না জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর দেননি।সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, বাস্তবে তার অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র এখনো কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আসতে পারেনি। গ্যাসের সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই জানা থাকলেও সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হলেও জনগণ প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছে না।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপসা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান সংকট কেবল একটি প্রকল্পের সমস্যা নয়, বরং দেশের জ্বালানি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতার প্রতিফলন। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা নিশ্চিত না করা হলে এ ধরনের প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একতরফাভাবে ভারতকে সুবিধা দেওয়ার নীতির কারণে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে আগের সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বেড়ে এখন ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে দেশকে বড় অঙ্কের ঋণের চাপ বহন করতে হচ্ছে।অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা উদ্বেগজনক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এমন সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঝুঁকি থেকেই যাবে। বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো প্রকল্পটিকে কার্যকরভাবে চালু করা। এজন্য প্রয়োজন হলে ভোলা থেকে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায়, ঋণের বোঝা আরও বাড়বে এবং এর চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়বে।
১৪ ঘন্টা আগে