আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন: জানাল ইরান
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি এবং আধা-রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি ও ফার্স নিউজ এজেন্সি খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। একইসঙ্গে হামলায় খামেনির মেয়ে, জামাতা ও নাতিও নিহত হয়েছেন। খবর আল জাজিরার।ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি আজ সকালে জানায়, ‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন’।তাসনিম নিউজে এজেন্সি জানায়, ‘ইরানের জনগণকে জানানো হচ্ছে যে, শনিবার ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে আমেরিকা ও জায়নিস্ট শাসনের যৌথ হামলায় ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শহীদ হয়েছেন।’এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও খামেনির মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল।পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনার পর শনিবার সকালে ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলায় তেহরানসহ পাঁচটি শহর লক্ষ্য করা হয়। পাশাপাশি ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমেও সাইবার হামলা চালানো হয়। অন্যদিকে ইরানও আশপাশের দেশ ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালায়। এসব ঘটনার মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর খবর এলো।একনজরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি১৯৮৯ সালে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এক দশক আগে পাহলভি রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ঘটানো ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক শক্তি ছিলেন খামেনি। কিন্তু ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো—যা শত্রুদের বিরুদ্ধে দেশটির প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে এবং সীমান্তের বাইরে প্রভাব বিস্তার করে-তা গড়ে তুলেছিলেন খামেনিই।সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এই দীর্ঘ যুদ্ধ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থনের কারণে অনেক ইরানির মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিজ্ঞতা খামেনির মধ্যে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস আরও গভীর করে।এই মনোভাবই তার কয়েক দশকের শাসনের ভিত্তি তৈরি করে এবং এই ধারণাকে শক্ত করে যে, ইরানকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকতে হবে।‘মানুষ ইরানকে একটি ধর্মতন্ত্র হিসেবে দেখে, কারণ তিনি পাগড়ি পরেন এবং রাষ্ট্রের ভাষা ধর্মের ভাষা,’ বলেন ইরান-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ‘Iran’s Grand Strategy: A Political History’ গ্রন্থের লেখক ভালি নাসর।‘কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট, যিনি যুদ্ধ থেকে এই ধারণা নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন যে ইরান ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন; এবং বিপ্লব, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ-এই তিনটি আলাদা নয়, বরং সুরক্ষার প্রয়োজন।’এই দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। খামেনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে আত্মনির্ভরতা বাড়াতে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ প্রচলন করেন, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নিয়ে গভীর সংশয় বজায় রাখেন এবং যারা বলতেন যে তার প্রতিরক্ষা-কেন্দ্রিক মনোভাব প্রয়োজনীয় সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করছে—তাদের কঠোরভাবে দমন করেন।তবে তার শাসন বহুবার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ২০০৯ সালে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর বিক্ষোভ, এবং ২০২২ সালে নারীদের অধিকার আন্দোলনের সময়।সম্ভবত তার শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে জানুয়ারিতে, যখন অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু বিক্ষোভকারী সরাসরি ইসলামী প্রজাতন্ত্র উৎখাতের দাবি তোলে। কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।শিক্ষাখামেনি ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুসলিম নেতার সন্তান এবং জাতিগতভাবে আজারবাইজানির বংশোদ্ভূত, যাদের শিকড় প্রতিবেশী ইরাকে। পরিবারটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে বসতি গড়ে, পরে মাশহাদে চলে আসে, যেখানে তার বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের ইমাম ছিলেন।খামেনি তার মা খাদিজেহ মিরদামাদিকে একজন কোরআন ও বইপ্রেমী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যিনি তার মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেন এবং পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সময় তাকে সমর্থন দেন।চার বছর বয়সে তিনি কোরআন শিক্ষা শুরু করেন এবং মাশহাদের প্রথম ইসলামী বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেননি। পরিবর্তে ধর্মতাত্ত্বিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং তার বাবা ও শেখ হাসেম গাজভিনির মতো খ্যাতনামা আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন। পরে তিনি নাজাফ ও কুমের উচ্চতর শিয়া শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে পড়াশোনা চালিয়ে যান।কুমে পড়ার সময় তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনিসহ একাধিক খ্যাতনামা আলেমের ঘনিষ্ঠ হন। খামেনি ফিকহ ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ক্লাস নিতেন, যা তাকে বিশেষ করে রাজতন্ত্রে হতাশ হয়ে পড়া তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে।সে সময় ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ ও মার্কিন সিআইএ পরিচালিত এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাহর পূর্ণ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। সেই অভ্যুত্থানে তেল শিল্প জাতীয়করণের চেষ্টা করা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খামেনি একাধিকবার গ্রেফতার হন এবং তাকে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসনে পাঠানো হয়। পরে তিনি ১৯৭৮ সালের বিক্ষোভে অংশ নেন, যা পাহলভি শাসনের পতন ঘটায়।সর্বোচ্চ নেতারাজতন্ত্র উৎখাতের পর খামেনি নতুন ইরান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৮০ সালে স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হন। তিনি তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন।১৯৮১ সাল ছিল তার জীবনের মোড় ঘোরানো বছর। বিরোধী সংগঠন মুজাহিদিন-ই খালকের এক হামলায় তিনি প্রাণে বাঁচলেও তার ডান হাত অকেজো হয়ে যায়। ওই বছরই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ইরানের প্রথম ধর্মীয় প্রেসিডেন্ট হন।১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জন্য এক বড় মোড় ছিল। খোমেনির মনোনীত উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলী মনতাজেরিকে ১৯৮৮ সালের গণহত্যার সমালোচনার কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়। সংবিধান সংশোধন কাউন্সিল তখন খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করে, যদিও সে জন্য শীর্ষ পদের যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে হয়।
২৯ মিনিট আগে