বেনজীরের দেশ-বিদেশে যত অবৈধ সম্পদ
পুলিশে থাকা অবস্থায় মানুষকে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে, পুলিশ সদস্যদের মাসিক টার্গেট দিয়ে, বদলি বাণিজ্য করে, অবৈধভাবে পুলিশে নিয়োগ দিয়ে ও রাতের আঁধারে অন্যের জায়গা দখল করে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যান সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। খুব কম সময়ে রিসোর্ট, বাড়ি, ফ্লাট, পাঁচ তারকা হোটেল, ইটভাটা, পোল্ট্রি খামার ও শত শত বিঘা জমির মালিক বনে যান বেনজীর। তিনি কখনো এসব সম্পদ নিজের নামে, কখনো আবার স্ত্রী ও শ্যালকের নামে দেখিয়েছেন। তবুও তার শেষ রক্ষা হয়নি। অবশেষে দুবাইয়ে গ্রেফতার হতে হয়েছে সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে। পুলিশ থেকে অবসর নেওয়ার পর খুব গোপনে দেশ ছাড়েন পুলিশের দুর্নীতিবাজ সাবেক এই কর্মকর্তা। এরপর তার অবৈধ সম্পদ নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বেনজীর এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে কোন কিছুর তোয়াক্কা করতেন না। তার বিলাসী জীবন, অঢেল সম্পত্তি আর বিপুল অর্থ পাচার সব মিলিয়ে তাকে দুর্নীতির ‘বরপুত্র’ বলা যায়। শুধু রাজধানীতেই নয়, সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে তার নামে-বেনামে সম্পদ রয়েছে, যা দুদক ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান ও কক্সবাজারে কয়েক শত একর জমি, বাড়ি, রিসোর্ট, খামার ও ফ্লাট রয়েছে বেনজীরের। বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন জেলায় থাকা জমির পরিমাণ ২ হাজার ৩৮৫ বিঘা বা ৭৮৬ একর। শুধু কি তাই, দেশের গন্ডি পেরিয়েও আরও পাঁচ দেশে তার সম্পদ গড়ার তথ্য মিলেছে।বেনজীর ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন। তার আগে ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল আইজিপি হন। ছিলেন ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পরে অবসরে যান। ২০২৪ সালের ২৩ ও ২৬ মে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে থাকা ১৯৩টি দলিলের জমি, গুলশানের চারটি ফ্ল্যাট ক্রোকের এবং বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ৩৩টি হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে ১৯টি প্রতিষ্ঠানে তার নামে থাকা শেয়ার, তিনটি বিও হিসাব এবং ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র অবরুদ্ধ করারও আদেশ দিয়েছিলেন।বেনজীর আগে দেশ ছাড়লেও পরে তার পরিবারকে দেশের বাইরে নিয়ে যান। সেসময় তিনি তার ব্যাংক হিসেবে থাকা ১৫ কোটি টাকা তুলে নেন, যা পরে দুদক জানতে পারে।রাজধানীতে পাঁচ ফ্ল্যাট, দুই বাড়ি: বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেন দুদক কর্মকর্তারা। তারা ঢাকার গুলশান ও বসুন্ধরায় বেনজীর পরিবারের পাঁচটি ফ্ল্যাট এবং উত্তরা ও ভাটারায় সাততলা দুটি বাড়ির সন্ধান পায়। এসব ফ্ল্যাট-বাড়ির দাম কমপক্ষে ৭৫ কোটি টাকা। দুই মেয়ের নামে শেয়ারে পাঁচ তারকা হোটেল:বেনজীরের দুই মেয়ে বিলাসী জীবনযাপন করতেন। তারা দামি গাড়িতে চলাচল ছাড়াও দামি ফ্লাটে থাকতেন। তাদের নামে ছিল পাঁচটি তারকা হোটেলের শেয়ার। দুদক তার দুই মেয়ের নামে বেস্ট হোল্ডিংস ও পাঁচ তারকা হোটেল লা মেরিডিয়েনের দুই লাখ শেয়ারের তথ্য পেয়েছে। র্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালীন ২০১৯ সালে বেস্ট হোল্ডিংসের দুই লাখ শেয়ার দুই মেয়ের জন্য কিনেছিলেন তিনি। গোপালগঞ্জে রিসোর্ট, চাষের জমি:বেনজীরের জন্মজেলা গোপালগঞ্জের সদর উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক, যা তার স্ত্রীর নামে ছিল। কিন্তু আসল মালিক ছিলেন বেনজীর। রিসোর্টটি তৈরির সময় বৈরাগীটোল গ্রামের লোকজনকে চাপ দিয়ে তিনি কম টাকায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমি কেনেন ও দখল করে নেন। এ ছাড়াও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৩০০ বিঘা চাষের জমি কিনেছিলেন। গোপালগঞ্জে রিসোর্ট, চাষের জমি:বেনজীরের জন্মজেলা গোপালগঞ্জের সদর উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন সাভানা ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড ন্যাচারাল পার্ক, যা তার স্ত্রীর নামে ছিল। কিন্তু আসল মালিক ছিলেন বেনজীর। রিসোর্টটি তৈরির সময় বৈরাগীটোল গ্রামের লোকজনকে চাপ দিয়ে তিনি কম টাকায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমি কেনেন ও দখল করে নেন। এ ছাড়াও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৩০০ বিঘা চাষের জমি কিনেছিলেন। গাজীপুরের রিসোর্টে শেয়ার: গাজীপুর সদর উপজেলায় ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সেন্টার গড়ে তোলেন বেনজীর। যদিও তিনি এটির পুরো মালিক নন। এতে তার ২৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। তবে এই শেয়ার কিনতে তার কোনো টাকা খরচ করতে হয়নি। ১৫০ বিঘা জমিজুড়ে এই রিসোর্ট গড়তে গিয়ে বন বিভাগের তিন দশমিক ৬৮ একর জমি দখল করা হয়েছে। এছাড়াও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বেতুয়ারটেক গ্রামে বেনজীর, তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের নামে অন্তত ৫০ বিঘা জমি রয়েছে, যা দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজারে সৈকতে জমি:দেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপেও তার সম্পদ রয়েছে। সেন্ট মার্টিনে বেনজীর নিজের নামে চার বিঘা বা এক একর ৭৫ শতক, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতে তার স্ত্রী ও তিন মেয়ের নামে ৭২ শতক জমি রয়েছে। এসব জমি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার থাকাকালে কিনেছিলেন। বান্দরবানে ২৫৭ বিঘা জমি: পাহাড়েও সম্পদ রয়েছে বেনজীরের। পাহাড়ি জেলা বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নে ও লামা উপজেলায় বেনজীর অন্তত ২৫৭ বিঘা জমি কিনেছেন। যার মধ্যে সুয়ালক ইউনিয়নে ৭৫ বিঘা এবং লামা উপজেলায় ১৮২ বিঘা জমি রয়েছে। দুদকের সন্ধানে বেরিয়ে আসে এসব জমির তথ্য। কিশোরগঞ্জে শত বিঘার খামার: বেনজীর আওয়ামী লীগের নেতাদের সহায়তায় কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ধরেয়ার বাজার এলাকায় শত বিঘা জমির একটি খামার গড়ে তোলেন।যা ছিল যৌথ মালিকানায়। স্বাস্থ্য খাতের বিতর্কিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর ভাই মানিক হাজি খামারটি দেখাশোনা করেন। এই খামারের আরেক অংশীদার মিঠু।সাতক্ষীরায় ইটভাটা দখল শ্যালকের:বেনজীর রাতের আধারে পুলিশ ও তার লোকজন দিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দক্ষিণ আলীপুর গ্রামে আশরাফুজ্জামান হাবলু নামে এক ব্যক্তির ৪৮ বিঘা জমির ওপর থাকা ইটভাটা দখল করেন। পরে ইটভাটাটি তিনি তার শ্যালক মির্জা আনোয়ার পারভেজকে দেখভালের জন্য দেন। এ দখল করেন তিনি যখন র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। এছাড়াও একই জেলার আশাশুনি উপজেলার শোভনালী ইউনিয়নের শরাফপুর গ্রামে তার শ্বাশুড়ী লুত্ফুন নেসার নামে শতাধিক বিঘা জমি দখল করেন। সেই জমিগুলোতে তিনি চারটি মাছের ঘের করেন। ওই এলাকার লোকজনের তথ্যে তার এমন সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে। ঠাকুরগাঁওয়ে পোলট্রি খামার: ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের বড় খোজাবাড়ী এলাকায় অন্তত ৫০ বিঘা জমির ওপর নর্থ পোলট্রি খামারে বেনজীরের অংশীদারত্ব রয়েছে বলে অভিযোগ। এতে যৌথ মালিকানা রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের বিতর্কিত ঠিকাদার মিঠুর।নীলফামারীতে পোলট্রি খামার ও কারখানা: নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে ভিন্ন জগত পার্কসংলগ্ন এলাকায় নর্থ পোলট্রি খামার নামে একটি মুরগির খামার এবং মুরগির খাবার উৎপাদন কারখানার উদ্বোধনের সময়ও বেনজীর আহমেদ ও ঠিকাদার মিঠু উপস্থিত ছিলেন। এই খামার ও কারখানা অন্তত ৫০ বিঘা জমির ওপর। এখানেও তাদের যৌথ মালিকানা রয়েছে বলে শোনা যায়।পাঁচ দেশে সম্পদের খোঁজ:বেনজীর দেশে যেমন অটেল সম্পদক করেছেন তেমনি বিদেশের মাটিতেও তার সম্পদ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার অঢেল সম্পদ রয়েছে, যা দুদক অনুসন্ধান করে পেয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ায় আবাসন খাতে তার বিনিয়োগের তথ্যও পেয়েছে দুদক। বেনজীর দেশ ছাড়ার পর দুবাইয়ে গিয়ে আশ্রয় নেন। ধারণা করা হয়, দুবাইয়ে তার সম্পদ ও ফ্ল্যাট রয়েছে।
৭ ঘন্টা আগে