দীর্ঘ লাইনের তেল যাচ্ছে কালোবাজারে, লাভ তুলছে অসাধু চক্র!
পাঠাও চালকদের অনেকে এখন গাড়ি চালাচ্ছেন নাপাড়া-মহল্লায় বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা লিটারসারাদিন তেল বিক্রি করেই আয় করছে এক থেকে দেড় হাজার টাকাদেশের বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানি তেল সংগ্রহের দীর্ঘ লাইনের সুযোগ নিয়ে একটি চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাঠাওসহ রাইড শেয়ারিং চালকদের একাংশ এবং কিছু যুবক নিয়মিত লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করে তা চড়া দামে কালোবাজারে বিক্রি করছেন।মোহাম্মদপুরের নাজমুল আলম (ছদ্মনাম) আগে একটি মোটরসাইকেল মেকানিকের দোকানে কাজ করতেন। দৈনিক আয় ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে এখন তিনি নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করে তা বিক্রি করছেন। এতে দৈনিক আয় হচ্ছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। গত এক সপ্তাহ ধরে তিনি এ কাজ করছেন।নাজমুলের মতো আরও অনেক যুবক ভোর ও দুপুরের পর পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করছেন। পরে স্থানীয় গ্যারেজ ও ব্যক্তিদের কাছে বেশি দামে তা বিক্রি করছেন।শুধু ঢাকায় নয়, গ্রামগঞ্জেও অনেকে পাম্প থেকে তেল তুলে পরে তা বিক্রি করে দিচ্ছে। আর এই কাজটি বেশি করছে উঠতি যুবকরা। গ্রামের পাম্পগুলোতে নজরদারি ও ফুয়েল পাসের তেমন কড়াকড়ি না থাকায় এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে তারা।নীলফামারীর সদর এলাকা থেকে আসা যুবক তানজিম বলেন, গ্রামে তো ঘণ্টাখানেক দাঁড়ালেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। ফলে একেকজন দুই থেকে তিনবার দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছে। পরে সেই তেল এলাকায় গিয়ে তারা বিক্রি করছে। গ্রামে অনেকেই প্রখর রোদের কারণে বাসা থেকে বের হচ্ছে না। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তারা পাম্প থেকে তেল নিয়ে দূরের গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব এলাকায় মোটরসাইকেল বেশি, সেসব এলাকার চায়ের দোকানেও তেল মিলছে। বিশেষ করে মাগুরা, কুষ্টিয়া, নড়াইল ও যশোরের কিছু এলাকায়।তেল তুলে মহল্লায় মহল্লায় বিক্রি:অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর, শাহবাগ, বনশ্রী, রমনা, মিরপুর ও তেজগাঁও এলাকার কিছু পাঠাও চালক, উঠতি যুবক ও কর্মক্ষম ব্যক্তিরা এসব করছে। সারাদিন পাঠাও না চালিয়ে বা কাজ না করে বসে থেকে দুইবার লাইনে দাঁড়িয়ে পাওয়া তেল বিক্রি করা হচ্ছে চড়া দামে। তবে তাদের পাশাপাশি লালবাগ, মীরহাজারবাগ, রায়েরবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ীতে থাকা বাইক মেরামতের গ্যারেজগুলোতে খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪ ঘণ্টা তেল দিচ্ছে এমন কয়েকটি পাম্পে ভোরবেলা দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন তারা। পরে দুপুরে সেই তেল পাওয়া যাচ্ছে। এরপর দ্রুত সেই তেল রেখে আবারও লাইনে দাঁড়াচ্ছে তারা। এভাবে চলছে তেল কারবার। লাইনে দাঁড়িয়ে চলছে নাস্তা ও দুপুরের খাবার।মোহাম্মদপুরের সেই নাজমুল বলেন, আমি প্রতিদিন দুইবার দাঁড়াই। দুই বেলায় এক হাজার করে দুই হাজার টাকার তেল পাই। পরে সেই তেল আড়াইশ টাকা লিটারে বিক্রি করি। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে তা এখন প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দিনে দুইবারে ৩ হাজার ৬০০ টাকার তেল বিক্রি করতে পারি। তাতে লাভ থাকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। আগে তো সারাদিন অন্যের গ্যারেজে কাজ করেও এমন টাকা পেতাম না। মালিককে বলেছি, আমি ছুটিতে। যত তেলের সংকট থাকবে, এটাই করব। গত সপ্তাহে মিরপুরে এক যুবকের সন্ধান মিলেছিল। সেই যুবক প্রতি লিটার তেল বিক্রি করতেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকায়। তবে সেই যুবক সম্প্রতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানা গেছে।নাজমুল ও অজ্ঞাত সেই যুবকের মতো এখন ঢাকার পাম্পগুলোতে সকাল থেকে ভিড় জমান তেল নিয়ে কালোবাজারে বিক্রিকারী ব্যক্তিরা। তাদের দেখলে বোঝা যায় না তারা তেল নিয়ে পরে বিক্রি করেন। বেশির ভাগই নিজেকে পাঠাও চালক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন।রোববার ভোর ছয়টায় আজিজ সুপার মার্কেট এলাকায় কথা হয় সুজন নামের এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল নিয়েছি। পরে শুনছি এলাকায় তেল আড়াইশ টাকায় প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে। তার মতে, লাইনে দাঁড়ানো ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মৌসুমি রাইড শেয়ারকারী, যারা তেল নিয়ে পরে বাজারে ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করছেন।সিরিয়াল বিক্রি:শুধু তেল বিক্রি নয়, আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। যারা ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে দাঁড়াচ্ছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে পরে তাদের অবস্থান ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করে দিচ্ছেন। এমন একটি ঘটনা জানা গেছে শাহবাগের পাম্পে তেল নিতে আসা এক যুবকের কাছ থেকে।সিয়াম নামের সেই যুবক বলেন, শুধু এই পাম্পে নয়, এখন প্রতিদিন লাইনের সিরিয়াল বিক্রি হয়। এটা বেশি চলে শাহবাগ, আগারগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকায়। ভোরবেলা লাইনে দাঁড়িয়ে সকাল হলে সেই লাইন বিক্রি করা হচ্ছে। আবার সেই লাইনের সিরিয়াল বিক্রিকারী ব্যক্তি শেষে দাঁড়াচ্ছেন। এভাবে দিনে দুই থেকে তিনবার সিরিয়াল বিক্রির মতো খেলাও জমে উঠেছে।তিনি আরও জানান, সিরিয়াল বিক্রির জন্য কেউ কেউ রাতেই মোটরসাইকেল রেখে যাচ্ছেন পাম্পের সামনে। আগে থেকেই পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরে সেই সিরিয়াল তাকে দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব বিষয় অনেকেই জানতেও পারছেন না। যা ঘটছে খুবই নীরবে। রাইড শেয়ারিং বাদ দিয়ে তেল নিয়ে বিক্রি চলছে:শাহবাগ, আগারগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকার তিনটি পাম্পে দাঁড়িয়ে তেল নেওয়া একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এখন রাইড শেয়ারকারীদের অনেকে গাড়ি চালাচ্ছেন না। তারা ভোরে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুরে তেল নিচ্ছেন। পরে সেই তেল বাসায় রেখে দুপুরে খেয়ে বিকেলে আবারও এসে লাইনে দাঁড়িয়ে রাতে তেল তুলছেন। পরে দুইবারের তেল একত্র করে কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করছেন তারা।বাইকাররা কেন এমন করছে?তেল তো ঠিকই মিলছে। এরই মধ্যে রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোতে ভাড়ার দামও বেড়েছে। কিন্তু এরপরও কেন রাইড শেয়ারকারীরা এমন করছে—এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে, তারা জানিয়েছে, সারাদিন পাঠাও চালিয়ে আয় হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। কিন্তু এখন দুইবার লাইনে দাঁড়ালে তারা দুই হাজার টাকার তেল পান। তা পরে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে পারছেন। এতে তাদের শুধু বসে থেকেই দেড় হাজার টাকার বেশি আয় হচ্ছে। তাছাড়া সম্প্রতি রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোতে যাত্রীর সংখ্যাও কমে গেছে বলে দাবি তাদের। ফলে এটাও অন্যতম কারণ।এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলামকে কয়েক দফা কল করার পর ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।এছাড়াও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এসএন নজরুল ইসলামকেও কল করা হয়েছিল। তিনি ব্যস্ত থাকায় ফোনে পাওয়া সম্ভব হয়নি।তবে মোহাম্মদপুর এলাকাটি ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের মধ্যে পড়ায় সেই জোনের ডিসি ইবনে মিজানকে একাধিকবার কল ও ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও পাওয়া যায়নি।
৭ ঘন্টা আগে