যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক বার্তা
নিজেদের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে পাল্টাপাল্টি সামরিক বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে ইরান চাইলে তার দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান পাঠিয়েছে দ্বিমুখী বার্তা।রোববার (২৬ এপ্রিল) ফক্স নিউজের ‘দ্য সানডে ব্রিফিং’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে ইরান যদি আলোচনা করতে চায়, তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।’মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘তারা (ইরান) যদি কথা বলতে চায়, তবে তারা আমাদের কাছে আসতে পারে অথবা আমাদের ফোন করতে পারে। আপনারা জানেন, সেখানে টেলিফোন আছে। আমাদের কাছে চমৎকার ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ইরান যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র এতে বিজয়ী হবে।’অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া দ্বিমুখী বার্তায় ইরান মনে করছে, পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে লোহিত সাগরে ক্রমবর্ধমান সংঘাত এবং পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় বর্তমান যুদ্ধবিরতি চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, তারা এই সংঘাতের একটি স্থায়ী সমাধান এবং যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানাচ্ছে। তাদের মতে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত হওয়ার পরেই কেবল পরবর্তী আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে।এই লক্ষ্য অর্জনে ইরান বর্তমানে দুটি ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে। প্রথমত, কূটনৈতিক মাধ্যম; যেখানে দেশটির প্রধানমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি বিভিন্ন আলোচনা ও মধ্যস্থতায় অংশ নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, সামরিক সতর্কতা; যার মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, শত্রুপক্ষের যেকোনো ধরনের ভুল হিসাব বা উস্কানির কড়া জবাব দিতে ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান আসলে একটি ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চাইছে, যাতে অঞ্চলটি বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়।এদিকে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধিদের পাকিস্তানে পাঠানোর কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের সেই সফর বাতিল করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফের একটি প্রতিনিধি দলের পাকিস্তানে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। মূলত ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি আলোচনার সূত্রপাত করতেই এই সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিজেই এই সফর বাতিলের ঘোষণা দেন। তবে কী কারণে হঠাৎ এই গুরুত্বপূর্ণ সফরটি বাতিল করা হলো, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কারণ এখনো জানানো হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ভূ-রাজনৈতিক কোনো সমীকরণ বা আলোচনার অভ্যন্তরীণ শর্ত নিয়ে জটিলতার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ট্রাম্প।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে দখলদার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইরানের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, মারা যান দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ শীর্ষ অনেক কর্মকর্তা। একটি স্কুলে হামলায় শতাধিক শিশুও মারা যায়। প্রাণ হারিয়েছে বহু বেসামরিক নাগরিকও।তবে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি ইরানও। তারা অনবরত ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে দেশটির বিভিন্ন শহর ফিলিস্তিনের গাজার মতো বানিয়ে দিয়েছে। প্রথমে আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং পরে তার ছেলে মোস্তফা খামেনির নেতৃত্বে হামলা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও। যার অধিকাংশই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধসিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও।এছাড়া তুরুপের তাস হিসেবে তাদের নিয়ন্ত্রিত অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ আমদানি-রফতানি হয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশ ছুঁতে শুরু করে। অবশেষে এক মাসের বেশি সময় যুদ্ধ চলার পর পাকিস্তানের মধ্যস্ততায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। গত ২২ এপ্রিল সেই সময়সীমা পার হওয়ার পর নানা হুমকি-ধমকি দিলেও পরে অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেমিডেন্ট ট্রাম্প।তবে সামরিক যুদ্ধ বন্ধ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অর্থনৈতিক যুদ্ধ এখনো চলমান। ভারত মহাসাগরে অবরোধ ঘোষণা করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের একটি কার্গোসহ তারা আটকে দিয়েছে বেশ কয়েকটি জাহাজ। এভাবে মোস্তফা খামেনিদের ওপর চাপ বাড়াতে ব্যস্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে মিত্র কয়েকটি দেশ বাদে অন্য সবার জন্য হরমুজ প্রণালি ফের বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। জাহাজ থেকে আদায় করা হচ্ছে টোল। যার ফলে দেশে দেশে জ্বালানি তেলের অবস্থা এখনো শোচনীয়। এই যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ না হলে পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হওয়ার শঙ্কা।তবে যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধের লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কারণ, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উভয় দেশই কঠিন কঠিন সব শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যার কোনোটাই মানছেন না ট্রাম্প কিংবা মোস্তফা খামেনি। তাই বিশ্বশান্তির কথা চিন্তা করে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সম্মত হবে, নাকি যেকোনো সময় আবারও শুরু হবে দুই দেশের ধ্বংসের খেলা, তাই নিয়ে মহাদুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি দেশসহ গোটা দুনিয়া।
৫ ঘন্টা আগে