দেশে প্রকৃত অর্থে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই—সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বারবার এ দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ডিপোতে তেল উপচে পড়ছে, আমদানি জাহাজ সাগরে অপেক্ষায়, আবার কোথাও কোথাও সরবরাহ ঘাটতির কারণে পেট্রোল পাম্পে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘ সারি। পুরো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে এক ধরনের অদৃশ্য অস্থিরতা, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বেসরকারি শোধনাগারগুলোর ডিপো এখন প্রায় পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে নতুন করে আসা জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজ পৌঁছালেও সব পণ্য দ্রুত খালাস করা যাচ্ছে না। কিছু লাইটার জাহাজ সাগরেই অপেক্ষায় রয়েছে, কারণ ডিপোতে খালি জায়গা নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর ও বিপিসি সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি একাধিক জাহাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এলেও সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে খালাস প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। এর ফলে সরবরাহ চেইনে তৈরি হচ্ছে চাপ।
দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম সুপার পেট্রোকেমিক্যাল দাবি করছে, তারা উৎপাদন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছে না। তাদের মতে, বিপিসির পক্ষ থেকে সময়মতো তেল গ্রহণ না করায় ট্যাংকার পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জানান, নির্ধারিত সরবরাহ না নেওয়ায় তাদের উৎপাদন চেইন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে তারা বারবার বিপিসিকে বাড়তি তেল নেওয়ার অনুরোধ জানালেও সাড়া মিলছে না।
অন্যদিকে বিপিসির সঙ্গে যুক্ত বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, ডিপোতে সংরক্ষণ সীমাবদ্ধতার কারণেই তারা সব সময় পর্যাপ্ত তেল তুলতে পারছে না। ফলে বাজারে সরবরাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প মালিকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে তেল বিতরণে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট পাম্পে বেশি সরবরাহ দেওয়া হলেও বেশির ভাগ পাম্পে পর্যাপ্ত তেল পৌঁছাচ্ছে না। এর ফলে অনেক এলাকায় সন্ধ্যার আগেই পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তাদের দাবি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিন বিতরণ কোম্পানির কিছু কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে এই বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সমানভাবে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
একাধিক পাম্প মালিকের ভাষ্য, একই জেলায় দুই ধরনের আচরণ দেখা যায়। কোথাও তেল উপচে পড়ে, আবার কোথাও পাম্প বন্ধ রাখতে হয়। এই বৈষম্যই মূল সংকট তৈরি করছে।
নরসিংদীর পাঠান পেট্রোল পাম্পের মালিক নিবিড় পাঠান জ্বালানি তেল বিতরণ ব্যবস্থায় বৈষম্য ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেছেন, পুরো খাতে একটি ‘নীলনকশা’ কাজ করছে, যার ফলে সাধারণ পাম্প মালিক ও গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনস্থ তিন বিতরণ কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির কিছু কর্মকর্তার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, এসব বিষয়ে বারবার সরকারকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিবিড় পাঠানের দাবি, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাত্র কয়েকটি পাম্পে অতিরিক্ত সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, যেখানে সারা রাত ধরে গ্রাহকরা তেল পাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে অনেক পাম্প পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা সন্ধ্যার আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তার ভাষায়, সব পাম্পে সমানভাবে তেল সরবরাহ করা হলে এমন সংকট তৈরি হতো না। কিছু নির্দিষ্ট পাম্পে বেশি তেল দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে, যা স্পষ্ট বৈষম্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক পাম্প মালিক দাবি করেন, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় দুই-একটি পাম্পে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, আর বাকিগুলো প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পেয়ে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
তেলের দামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকারের নির্ধারিত দামে সারা দেশে জ্বালানি বিক্রি করার নিয়ম থাকলেও কিছু এলাকায় নতুন দামে বিক্রি করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসনের একটি অভিযানে নতুন নির্ধারিত দামে বিক্রি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পাম্প মালিক নিবিড় পাঠানের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও পর্যাপ্ত নয়। তার মতে, অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায় না, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পাম্প মালিক বলেন, খুচরা ব্যবসায়ী, বিতরণ কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের বড় ঘাটতি রয়েছে। এই ব্যবধান নিচের পর্যায়ের সমস্যাগুলো উপরে ঠিকভাবে পৌঁছাতে দিচ্ছে না, ফলে কার্যকর পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিপিসি দাবি করছে, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরও সমপরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত, কালোবাজারি এবং অতিরিক্ত কেনার প্রবণতার কারণে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপই পাম্পে লম্বা লাইনের কারণ।
এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, মোবাইল কোর্ট অভিযান এবং অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। হাজার হাজার অভিযান, মামলা ও জব্দ কার্যক্রম চালানোর তথ্যও দিয়েছে সরকার।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আসল সমস্যা সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা। ডিপো থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত পুরো চেইনে সমন্বয় না থাকায় কোথাও তেল জমে থাকছে, আবার কোথাও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজ সময়মতো খালাস না হওয়ায় সাগরে জাহাজ আটকে আছে। অন্যদিকে ডিপো পূর্ণ থাকায় নতুন করে তেল গ্রহণে বাধা তৈরি হচ্ছে। এই দুই প্রান্তের চাপ মাঝখানে এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকার পাম্প মালিকদের কমিশন বাড়িয়েছে। এতে কিছু মালিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রতি লিটার বিক্রিতে ডিলাররা নির্দিষ্ট কমিশন পাচ্ছেন, যা আগের তুলনায় বেশি। ফলে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ও বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কমিশন কাঠামো সরবরাহব্যবস্থার মূল সমস্যার সমাধান নয়।
জাতীয় সংসদে জ্বালানি খাত নিয়ে আলোচনায় সরকার দলীয় মন্ত্রী পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, দেশে কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে বিরোধী পক্ষ বলছে, মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সংসদে আলোচনায় উঠে এসেছে, সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এই অস্থিরতা চলতেই থাকবে।
সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। তারা জানান, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
মন্ত্রীরা বলেন, সরকার সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মধ্যে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং নিয়মিত অভিযান অন্তর্ভুক্ত। হাজারো অভিযান, মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে। তারা আরও বলেন, বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার দাবি করেছে, মূল সমস্যা সংকট নয়, বরং বিতরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং অস্থিরতা। এ বিষয়ে সরকার বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি পেতে পারে। তারা আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত বাজার স্থিতিশীল হয়ে সংকটের ধারণা দূর হবে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।
সব মিলিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থায় রয়েছে বড় ধরনের সমন্বয় সমস্যা। ডিপোতে জায়গার সংকট, বেসরকারি শোধনাগারের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, বিতরণ পর্যায়ের বৈষম্য এবং প্রশাসনিক জটিলতা মিলেই তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত থাকলেও সরকারের বক্তব্যের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। তিনি বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও মানুষ রাস্তায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা জনভোগান্তি আরও বাড়াচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে সেই বার্তা স্পষ্ট নয়। জনগণকে বোঝাতে হবে কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এতে তাদের কী উপকার হচ্ছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম মন্তব্য করেন, তিনি এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কোনো জনকল্যাণ দেখছেন না। তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ অবশ্যই জনগণবান্ধব হওয়া উচিত এবং জনগণের স্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অনিয়মের শিকার হচ্ছে। এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলামকে একাধিক বার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি।

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
দেশে প্রকৃত অর্থে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই—সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বারবার এ দাবি করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। ডিপোতে তেল উপচে পড়ছে, আমদানি জাহাজ সাগরে অপেক্ষায়, আবার কোথাও কোথাও সরবরাহ ঘাটতির কারণে পেট্রোল পাম্পে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘ সারি। পুরো জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে এক ধরনের অদৃশ্য অস্থিরতা, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং বেসরকারি শোধনাগারগুলোর ডিপো এখন প্রায় পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে নতুন করে আসা জ্বালানি তেল সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজ পৌঁছালেও সব পণ্য দ্রুত খালাস করা যাচ্ছে না। কিছু লাইটার জাহাজ সাগরেই অপেক্ষায় রয়েছে, কারণ ডিপোতে খালি জায়গা নেই।
চট্টগ্রাম বন্দর ও বিপিসি সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি একাধিক জাহাজে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এলেও সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে খালাস প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। এর ফলে সরবরাহ চেইনে তৈরি হচ্ছে চাপ।
দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম সুপার পেট্রোকেমিক্যাল দাবি করছে, তারা উৎপাদন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করতে পারছে না। তাদের মতে, বিপিসির পক্ষ থেকে সময়মতো তেল গ্রহণ না করায় ট্যাংকার পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জানান, নির্ধারিত সরবরাহ না নেওয়ায় তাদের উৎপাদন চেইন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে তারা বারবার বিপিসিকে বাড়তি তেল নেওয়ার অনুরোধ জানালেও সাড়া মিলছে না।
অন্যদিকে বিপিসির সঙ্গে যুক্ত বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, ডিপোতে সংরক্ষণ সীমাবদ্ধতার কারণেই তারা সব সময় পর্যাপ্ত তেল তুলতে পারছে না। ফলে বাজারে সরবরাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প মালিকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে তেল বিতরণে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট পাম্পে বেশি সরবরাহ দেওয়া হলেও বেশির ভাগ পাম্পে পর্যাপ্ত তেল পৌঁছাচ্ছে না। এর ফলে অনেক এলাকায় সন্ধ্যার আগেই পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তাদের দাবি, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিন বিতরণ কোম্পানির কিছু কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে এই বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। সমানভাবে সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় সাধারণ গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
একাধিক পাম্প মালিকের ভাষ্য, একই জেলায় দুই ধরনের আচরণ দেখা যায়। কোথাও তেল উপচে পড়ে, আবার কোথাও পাম্প বন্ধ রাখতে হয়। এই বৈষম্যই মূল সংকট তৈরি করছে।
নরসিংদীর পাঠান পেট্রোল পাম্পের মালিক নিবিড় পাঠান জ্বালানি তেল বিতরণ ব্যবস্থায় বৈষম্য ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেছেন, পুরো খাতে একটি ‘নীলনকশা’ কাজ করছে, যার ফলে সাধারণ পাম্প মালিক ও গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনস্থ তিন বিতরণ কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির কিছু কর্মকর্তার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। তার অভিযোগ, এসব বিষয়ে বারবার সরকারকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিবিড় পাঠানের দাবি, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মাত্র কয়েকটি পাম্পে অতিরিক্ত সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, যেখানে সারা রাত ধরে গ্রাহকরা তেল পাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে অনেক পাম্প পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা সন্ধ্যার আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তার ভাষায়, সব পাম্পে সমানভাবে তেল সরবরাহ করা হলে এমন সংকট তৈরি হতো না। কিছু নির্দিষ্ট পাম্পে বেশি তেল দিয়ে অন্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে, যা স্পষ্ট বৈষম্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক পাম্প মালিক দাবি করেন, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় দুই-একটি পাম্পে অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, আর বাকিগুলো প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পেয়ে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
তেলের দামের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সরকারের নির্ধারিত দামে সারা দেশে জ্বালানি বিক্রি করার নিয়ম থাকলেও কিছু এলাকায় নতুন দামে বিক্রি করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসনের একটি অভিযানে নতুন নির্ধারিত দামে বিক্রি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা বাজারব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও দাবি করেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে অসামঞ্জস্যের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পাম্প মালিক নিবিড় পাঠানের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও পর্যাপ্ত নয়। তার মতে, অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায় না, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পাম্প মালিক বলেন, খুচরা ব্যবসায়ী, বিতরণ কোম্পানি ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের বড় ঘাটতি রয়েছে। এই ব্যবধান নিচের পর্যায়ের সমস্যাগুলো উপরে ঠিকভাবে পৌঁছাতে দিচ্ছে না, ফলে কার্যকর পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিপিসি দাবি করছে, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরও সমপরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত, কালোবাজারি এবং অতিরিক্ত কেনার প্রবণতার কারণে বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপই পাম্পে লম্বা লাইনের কারণ।
এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, মোবাইল কোর্ট অভিযান এবং অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। হাজার হাজার অভিযান, মামলা ও জব্দ কার্যক্রম চালানোর তথ্যও দিয়েছে সরকার।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আসল সমস্যা সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা। ডিপো থেকে শুরু করে পাম্প পর্যন্ত পুরো চেইনে সমন্বয় না থাকায় কোথাও তেল জমে থাকছে, আবার কোথাও ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজ সময়মতো খালাস না হওয়ায় সাগরে জাহাজ আটকে আছে। অন্যদিকে ডিপো পূর্ণ থাকায় নতুন করে তেল গ্রহণে বাধা তৈরি হচ্ছে। এই দুই প্রান্তের চাপ মাঝখানে এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর সরকার পাম্প মালিকদের কমিশন বাড়িয়েছে। এতে কিছু মালিক সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রতি লিটার বিক্রিতে ডিলাররা নির্দিষ্ট কমিশন পাচ্ছেন, যা আগের তুলনায় বেশি। ফলে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আয়ও বেড়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কমিশন কাঠামো সরবরাহব্যবস্থার মূল সমস্যার সমাধান নয়।
জাতীয় সংসদে জ্বালানি খাত নিয়ে আলোচনায় সরকার দলীয় মন্ত্রী পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, দেশে কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে বিরোধী পক্ষ বলছে, মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সংসদে আলোচনায় উঠে এসেছে, সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এই অস্থিরতা চলতেই থাকবে।
সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের কোনো সংকট নেই। তারা জানান, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
মন্ত্রীরা বলেন, সরকার সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মধ্যে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং নিয়মিত অভিযান অন্তর্ভুক্ত। হাজারো অভিযান, মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে। তারা আরও বলেন, বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা ও বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার দাবি করেছে, মূল সমস্যা সংকট নয়, বরং বিতরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং অস্থিরতা। এ বিষয়ে সরকার বলছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে যাতে ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি পেতে পারে। তারা আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত বাজার স্থিতিশীল হয়ে সংকটের ধারণা দূর হবে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।
সব মিলিয়ে দেশে জ্বালানি তেলের প্রকৃত ঘাটতি না থাকলেও পুরো সরবরাহব্যবস্থায় রয়েছে বড় ধরনের সমন্বয় সমস্যা। ডিপোতে জায়গার সংকট, বেসরকারি শোধনাগারের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, বিতরণ পর্যায়ের বৈষম্য এবং প্রশাসনিক জটিলতা মিলেই তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত থাকলেও সরকারের বক্তব্যের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। তিনি বলেন, তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও মানুষ রাস্তায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছে, যা জনভোগান্তি আরও বাড়াচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে সেই বার্তা স্পষ্ট নয়। জনগণকে বোঝাতে হবে কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এতে তাদের কী উপকার হচ্ছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম মন্তব্য করেন, তিনি এই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তে কোনো জনকল্যাণ দেখছেন না। তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আচরণ অবশ্যই জনগণবান্ধব হওয়া উচিত এবং জনগণের স্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অনিয়মের শিকার হচ্ছে। এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জনগণের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলামকে একাধিক বার ফোন করা হলেও রিসিভ করেননি।

আপনার মতামত লিখুন